আগের রাতে বড় ভাইকে ফোন করেছিলেন জুয়েল মাদবর। জানিয়েছিলেন, ব্যবসার কাজে নাটোর যাবেন। সবাই মিলে পদ্মা সেতুর গোড়া থেকে বাসে উঠবেন, গন্তব্য তাহেরপুর—সেখান থেকে ভুট্টাসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য কিনে আনবেন। কথাবার্তা ছিল একেবারেই স্বাভাবিক। কে জানত, ভাইয়ের সঙ্গে সেটিই হয়ে থাকবে তার জীবনের শেষ কথোপকথন!
বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে আদর করে গেছেন চার বছরের মেয়ে রিদিতা ও দুই বছরের ছেলে সাইফানকে। কথা দিয়েছিলেন, ফেরার পথে তাদের জন্য চকলেট নিয়ে আসবেন। ছোট্ট দুই শিশুর কাছে বাবার সেই প্রতিশ্রুতিই ছিল আনন্দের অপেক্ষা। কিন্তু পরদিন সকালে শাহজাহান মাদবরের ফোনে এলো এমন এক খবর, যা মুহূর্তেই পাল্টে দিল পুরো পরিবারের জীবন— নাটোরে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন তার ছোট ভাই জুয়েল।
যে বাবা সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে জীবিকার সন্ধানে ঘর ছেড়েছিলেন, তাকে আর চকলেট হাতে ফিরতে হয়নি। ফিরেছেন নিথর দেহ হয়ে। শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার বড়কান্দি ইউনিয়নের সেই বাড়িতে এখন স্বামীর শোকে স্তব্ধ মৌসুমী আক্তার। আর রিদিতা-সাইফানের কাছে বাবার অনুপস্থিতির অর্থ এখনো পরিষ্কার নয়। তারা মায়ের কাছে জানতে চায়, ‘বাবা কই, মা কখন আসবে?’
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া এলাকায় নাটোর-পাবনা মহাসড়কের সরকারপাড়া অংশে বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান জুয়েলসহ জাজিরার পাঁচ ব্যবসায়ী।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোরে ঘটে যাওয়া এ দুর্ঘটনায় মোট ১৪ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আহত হয়েছেন আরও ৩০জন।
একই এলাকার পাঁচ ব্যবসায়ীর এমন আকস্মিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে জাজিরার কাজিরহাট ও আশপাশের এলাকায়। জীবিকার প্রয়োজনে একসঙ্গে যাত্রা শুরু করেছিলেন তারা। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই থেমে গেছে তাদের পথচলা। পেছনে পড়ে রয়েছে অপেক্ষায় থাকা পরিবার, অসমাপ্ত স্বপ্ন আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
জুয়েলের বড় ভাই শাহজাহান মাদবরের কাছে এখনো স্পষ্ট আগের রাতের সেই কথোপকথন। ছোট ভাই ফোন করে জানিয়েছিলেন, ভুট্টা কিনতে নাটোর যাবেন। কীভাবে যাবেন, জানতে চেয়েছিলেন শাহজাহান। জুয়েল বলেছিলেন, সবাই একসঙ্গে পদ্মা সেতুর গোড়া থেকে বাসে উঠবেন।
শাহজাহান মাদবর বলেন, গত রাতে জুয়েল আমাকে ফোন দিয়ে বলেছিল, ভুট্টা কিনতে নাটোর যাবে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কীভাবে যাবি? সে বলেছিল, সবাই একসঙ্গে পদ্মা সেতুর গোড়া থেকে বাসে উঠবে। এরপর সকালে ফোন পাই, আমার ভাই নাটোরে মারা গেছে। রাতে যে ভাইয়ের সঙ্গে কথা হলো, সকালে শুনলাম সে আর নেই।
কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে স্বাভাবিক একটি কথোপকথন পরিণত হয়েছে জীবনের শেষ স্মৃতিতে। যে ভাইয়ের সঙ্গে ব্যবসার পরিকল্পনা নিয়ে কথা হয়েছিল, পরদিন তার মৃত্যুর খবর শুনতে হবে—এমন বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না শাহজাহান।
জুয়েলের পরিবারের শোক আরও গভীর হয়েছে তার দুই শিশুসন্তানের দিকে তাকালে। চার বছরের রিদিতা আর দুই বছরের সাইফান— যে বয়সে বাবার হাত ধরে হাঁটা, কোলে চড়া কিংবা ছোট্ট আবদার পূরণ হওয়ার কথা, সেই বয়সেই তাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেল বাবা।
শিশুদের কাছে হয়তো এখনো মনে হচ্ছে, বাবা কোথাও গেছেন, একটু পরেই ফিরে আসবেন। কিন্তু পরিবারের বড়দের জানা, সেই অপেক্ষার আর কোনো সমাপ্তি নেই। সময়ের সঙ্গে তারা বড় হবে, বুঝতে শিখবে বাবার অনুপস্থিতি। তখন বাবার সঙ্গে কাটানো স্মৃতির বদলে তাঁকে চিনতে হবে স্বজনদের মুখে শোনা গল্পে।
প্রায় দুই যুগ ধরে জাজিরার কাজিরহাট এলাকায় ব্যবসা করতেন জুয়েল মাদবর। ভুসামালের ব্যবসার পাশাপাশি রড-সিমেন্টের ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে স্থানীয় বাজারে পরিচিতি গড়ে উঠেছিল তার।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, সংসারের প্রয়োজন মেটানো এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়েই চলছিল তার জীবন। ব্যবসার কাজে রাজশাহীর তাহেরপুরে যাওয়াও ছিল সেই নিয়মিত জীবনযাত্রার অংশ। সেখানে ভুট্টাসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য কিনে আনার পরিকল্পনা ছিল তার।
প্রায় এক বছর আগে জুয়েলের বাবাও মারা যান। সেই শোক কাটিয়ে পরিবার যখন আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছিল, তখনই এ দুর্ঘটনা কেড়ে নিল পরিবারের আরেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে। এবার হারাতে হলো সংসারের উপার্জনক্ষম সদস্য, দুই শিশুর বাবা এবং একজন স্বামীকে।
একদিকে ভাই হারানোর বেদনা, অন্যদিকে স্ত্রী ও দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ— সব মিলিয়ে পরিবারটির সামনে এখন শোকের পাশাপাশি কঠিন বাস্তবতার প্রশ্ন।
জুয়েলের সঙ্গে প্রাণ হারিয়েছেন জাজিরা উপজেলার আরও চার ব্যবসায়ী। তারা হলেন- ডুবিসায়বর মোল্যাকান্দি এলাকার সালাল মোল্যা, ডুবিসায়বর কাজিরহাট এলাকার সোহাগ শিকদার, কাজিরহাট এলাকার সামাদ ফকির এবং পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া এলাকার শাহিন বেপারী।
সালাল মোল্যা ছিলেন জাহান উদ্দিন মোল্যার ছেলে। সোহাগ শিকদার ছিলেন ইউনুস শিকদারের ছেলে। শাহিন বেপারী ছিলেন রাজ্জাক বেপারীর ছেলে। সামাদ ফকির কাজিরহাট এলাকার ভুসামাল ব্যবসায়ী ছিলেন। শাহিন বেপারী যুক্ত ছিলেন হলুদের ব্যবসায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত পাঁচজনই জাজিরার কাজিরহাট ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করতেন। ব্যবসার প্রয়োজনে তারা রাজশাহীর তাহেরপুরে যাচ্ছিলেন। সেখানে ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন, ধনিয়াসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য কেনার পরিকল্পনা ছিল তাদের।
কেউ ভুসামালের ব্যবসা করতেন, কেউ রড-সিমেন্টের, আবার কেউ হলুদসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক তাদের মধ্যে গড়ে তুলেছিল পরিচিতি ও পারস্পরিক নির্ভরতা। জীবিকার তাগিদে একসঙ্গে পথ চলতে গিয়ে এবার একই দুর্ঘটনায় শেষ হলো তাদের পাঁচজনের জীবন।
এই পাঁচ ব্যবসায়ীর আয়েই চলত তাদের সংসার। তাদের ঘিরেই ছিল স্ত্রী-সন্তানদের স্বপ্ন, পরিবারের নানা প্রয়োজন আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। প্রতিদিনের মতো এবারও স্বজনেরা তাদের ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলেন। কেউ অপেক্ষা করছিলেন প্রিয় মানুষের জন্য, কেউ সংসারের প্রয়োজন মেটাতে কেনা পণ্যের জন্য। আর জুয়েলের দুই শিশু অপেক্ষায় ছিল বাবার আনা চকলেটের।
একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই বদলে দিল পাঁচটি পরিবারের পরিচিত জীবন। যে মানুষগুলো ছিলেন পরিবারের ভরসা, তাদের অনুপস্থিতিতে এখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সংসার চালানো, সন্তানদের বড় করে তোলা এবং ভবিষ্যৎ সামলানোর কঠিন বাস্তবতা।
চালককে সতর্ক করেছিলেন যাত্রীরা
দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া আলমগীর মাদবরের ভাষ্য অনুযায়ী, যাত্রাবিরতির পর বাসটি অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলছিল। তার দাবি, চালককে তন্দ্রাচ্ছন্ন মনে হওয়ায় যাত্রীরা তাকে সতর্ক করেছিলেন এবং গতি কমানোর অনুরোধ জানিয়েছিলেন। পরে বাসটির সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
মহাসড়কের সেই সংঘর্ষে ১৪ জন প্রাণ হারান বলে জানা গেছে। আহতদের পাশাপাশি নিহতদের স্বজনদের জীবনেও নেমে এসেছে গভীর বিপর্যয়। যারা ব্যবসা ও জীবিকার প্রয়োজনে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন, তাদের অনেকেরই আর আপনজনের কাছে ফিরে যাওয়া হয়নি।
সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানের বাইরে প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে যে আলাদা একটি সংসার, অসংখ্য স্মৃতি ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা জড়িয়ে থাকে, এই ঘটনাও তার নির্মম উদাহরণ।
শোকের সঙ্গে অনিশ্চয়তাও
স্বজন হারানোর বেদনার পাশাপাশি নিহতদের পরিবারগুলোর পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল-ইমরান।
তবে তাৎক্ষণিক সহযোগিতার আশ্বাসের বাইরেও পরিবারগুলোর সামনে রয়েছে দীর্ঘ পথ। যাদের উপার্জনে সংসার চলত, তাদের হারিয়ে দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো থেকে শুরু করে সন্তানদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা—সবকিছুই এখন নতুন করে ভাবতে হবে স্বজনদের।
বিশেষ করে জুয়েলের পরিবারে এই শূন্যতা আরও গভীর। চার বছরের রিদিতা ও দুই বছরের সাইফানের বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে বাবার অনুপস্থিতি অনুভূত হবে। তাদের ছোট ছোট আবদার, স্কুলে যাওয়ার দিনগুলো, অসুখে পাশে থাকার প্রয়োজন কিংবা জীবনের নানা আনন্দ-বেদনায় বাবার যে ভূমিকা থাকার কথা, তা আর পূরণ হওয়ার নয়।
জুয়েল হয়তো ভেবেছিলেন, ব্যবসা থেকে ফিরে সন্তানদের হাতে চকলেট তুলে দেবেন। তাদের হাসিমুখ দেখবেন, স্ত্রীর সঙ্গে ভাগ করে নেবেন দিনের গল্প। ভবিষ্যতের জন্য আরও কিছু পরিকল্পনা করবেন। কিন্তু সেই ছোট ছোট স্বপ্ন পূরণের সুযোগটুকুও আর পেলেন না তিনি।
এখন তার বাড়িতে রয়ে গেছে প্রতিশ্রুত সেই চকলেটের গল্প, শেষ রাতের ফোনালাপ আর বাবার জন্য দুই শিশুর অবুঝ প্রশ্ন।
জীবিকার সন্ধানে ঘর ছেড়ে যাওয়া পাঁচ ব্যবসায়ীর মৃত্যু তাই শুধু একটি সড়ক দুর্ঘটনার খবর নয়। এটি পাঁচটি পরিবারের নির্ভরতার জায়গা হারানোর গল্প, প্রিয়জনের ফিরে আসার অপেক্ষা ভেঙে যাওয়ার গল্প, আর হঠাৎ করেই ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে যাওয়া অসংখ্য স্বজনের গল্প।
তবে সবচেয়ে ভারী শোক হয়তো জুয়েলের ঘরেই জমে থাকবে। রিদিতা আর সাইফান হয়তো আরও অনেক দিন মায়ের কাছে জানতে চাইবে, বাবা কোথায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে একসময় তারা বুঝবে, কেন বাবা আর ফেরেননি। তখন বাবার স্মৃতি খুঁজতে হবে পুরনো ছবি, স্বজনদের বলা গল্প আর পরিবারের মানুষের চোখের জলে।
যে বাবা সন্তানদের জন্য চকলেট নিয়ে ফেরার কথা দিয়েছিলেন, তিনি আর কোনো দিন ফিরবেন না। তার সেই প্রতিশ্রুতি অপূর্ণই থেকে যাবে। আর দুই শিশুর শৈশবে বাবার জন্য অপেক্ষার জায়গাটি হয়ে থাকবে এক গভীর, অপূরণীয় শূন্যতা।
প্রতিনিধি/এএইচ



