দুর্গাপূজার আনন্দ মুহূর্তেই বিষাদে পরিণত হলো একটি পরিবারের জন্য। পিরোজপুরের নাজিরপুর ও নেছারাবাদ উপজেলার সীমান্তবর্তী শ্রীরামকাঠী-ভরতকাঠী ফেরিঘাট এলাকায় কালিগঙ্গা নদীতে অতিরিক্ত যাত্রী ও মোটরসাইকেলবোঝাই একটি ট্রলার ডুবে যায়। এতে ট্রলারে থাকা ৫০ জন যাত্রীর মধ্যে অধিকাংশ সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও নিখোঁজ হন একই পরিবারের মা ও মেয়ে। সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
পরে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল দুই দফা অভিযান চালিয়ে আট বছর বয়সী শিশু অর্পিতা বেপারীর মরদেহ উদ্ধার করে। তবে তার মা রিনা বেপারী এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
নিহত অর্পিতা ও নিখোঁজ রিনা নেছারাবাদ উপজেলার গুয়ারেখা ইউনিয়নের ভরতকাঠী গ্রামের বাসিন্দা। অর্পিতার বাবা শংকর বেপারী ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাপ্রহরী হিসেবে কাজ করেন। দুর্গাপূজার ছুটিতে তিনি পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন। সোমবার রাতে শ্রীরামকাঠী থেকে প্রতিমা দর্শন ও পূজা শেষে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ট্রলারে করে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। পথে ট্রলারডুবিতে প্রাণ হারায় তার আট বছরের মেয়ে। নিখোঁজ হন স্ত্রী।
প্রত্যক্ষদর্শী ও দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া এক যাত্রী জানান, নাজিরপুর প্রান্ত থেকে ভরতকাঠী ফেরিঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার সময় ট্রলারটিতে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী তোলা হয়েছিল। এ ছাড়া ছিল অন্তত আটটি ভারী মোটরসাইকেল। অতিরিক্ত বোঝার কারণে ট্রলারটি ভারসাম্য হারায়। ঘাট ছাড়ার পরপরই সেটি নদীতে ডুবে যায়। এ সময় চারদিকে বাঁচার আকুতি ও হাহাকার শুরু হয়। অধিকাংশ যাত্রী সাঁতরে এবং স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তীরে উঠতে পারলেও রিনা ও অর্পিতা নিখোঁজ হন।
মেয়ে ও স্ত্রীকে হারিয়ে শোকাহত শংকর বেপারী বলেন, গত রাতেও মেয়ে আমার সঙ্গে ঘুমিয়েছে। আজ সে মৃত। আমি কীভাবে রাতগুলো পার করব? নৌকাডুবির পর যখন আমার পরিবারের সদস্যদের খুঁজে পাচ্ছিলাম না, তখন হাসপাতালসহ আশপাশের নদীতে খুঁজেছি। সবাই তীরে উঠলেও তারা নিখোঁজ ছিল। এখন মেয়ে মারা গেছে, তার মাও বেঁচে আছে কি না জানি না।
দুর্ঘটনাস্থল ও উদ্ধার অভিযান তদারকি করতে সেখানে যান নাজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাজিয়া শাহনাজ তমা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আহসান হাবিব এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) নাসরিন জাহান। উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দিতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন পিরোজপুর জেলা ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক রায়হানুর আশরাফ ও নাজিরপুর ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শক সোয়াইব হোসেন মুন্সি। এ ছাড়া নাজিরপুর ও নেছারাবাদ থানার পুলিশের যৌথ দল আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ঘটনাস্থলে অবস্থান করে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজিয়া শাহনাজ তমা জানান, তীব্র পানির স্রোতের মধ্যেও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল দুই দফা অভিযান চালিয়ে শিশু অর্পিতার মরদেহ উদ্ধার করেছে। তবে রাতের অন্ধকার ও নদীর প্রতিকূল পরিবেশের কারণে উদ্ধার অভিযান ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় রাতের মতো কাজ স্থগিত রাখা হয়। মঙ্গলবার সকালে নিখোঁজ রিনা বেপারীকে উদ্ধারে আবার অভিযান শুরু করার কথা ছিল।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বেলা ১২টার দিকে দুর্ঘটনাস্থল নাজিরপুরের শ্রীরামকাঠী ও নেছারাবাদের ভরতকাঠী খেয়াঘাট এলাকা পরিদর্শন করেন পিরোজপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মেদ সোহেল মনজুর। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক মো. গোলাম রাব্বানী, পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান, নাজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ফায়ার সার্ভিস ও নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা এবং নাজিরপুর থানার পুলিশের একটি দল।
একদিকে শিশুর নিথর দেহ, অন্যদিকে নিখোঁজ মায়ের সন্ধানের অপেক্ষা—নদীর পাড়ে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। তাঁদের কান্নায় শ্রীরামকাঠী ও ভরতকাঠী ফেরিঘাট এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। পূজার আনন্দ ম্লান হয়ে সেখানে বিরাজ করে গভীর শোক।
মঙ্গলবার বেলা আড়াইটায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কালিগঙ্গা নদীতে নিখোঁজ নারীকে উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিস ও নৌবাহিনীর ডুবুরি দলের অভিযান চলছিল।
এআর




