ভোরের ঘাসে শিশির, মাঠের বুকে হালকা কুয়াশা, বাতাসে শীতের মিষ্টি আভাস। হেমন্তের এই স্নিগ্ধ সকালে যশোরের গ্রামবাংলায় শুরু হয়েছে এক চিরচেনা কর্মযজ্ঞ। কাঁধে দা, হাতে দড়ি নিয়ে খেজুরগাছের ডালে ডালে ব্যস্ত গাছিরা। কেউ গাছের ডালপালা পরিষ্কার করছেন, কেউ চেঁছে নিচ্ছেন গাছের বুক। কয়েক সপ্তাহের অপেক্ষা শেষে সেই গাছ থেকেই ঝরবে মিষ্টি রস। ভোরের আলো ফোটার আগেই মাটির ভাঁড়ভর্তি রস নিয়ে মেঠোপথ ধরে বাড়ি ফিরবেন গাছিরা। উঠোনের উনুনে রস জ্বালানোর সঙ্গে বাতাসে ছড়িয়ে পড়বে খেজুরের গুড়ের ম-ম ঘ্রাণ। তৈরি হবে পাটালি, আর শীতের পিঠা-পায়েশের আয়োজনে পূর্ণতা পাবে গ্রামবাংলার চিরায়ত উৎসব।
‘যশোরের যশ, খেজুরের রস’— শুধু একটি প্রবাদ নয়, এটি এ অঞ্চলের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির পরিচয়। শীতের আগমনী বার্তায় সেই ঐতিহ্যকে ঘিরেই নতুন করে স্বপ্ন বুনছেন যশোরের গাছি, কৃষক ও উদ্যোক্তারা। ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে খেজুরগাছ প্রস্তুতের প্রথম ধাপ। আর তিন সপ্তাহের মধ্যে শুরু হতে পারে রস সংগ্রহ। এরপর রস থেকে গুড় ও পাটালি তৈরির ব্যস্ততায় মুখর হয়ে উঠবে গ্রামবাংলা।
কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, দেশে খেজুরের গুড় উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয় যশোর জেলায় বর্তমানে খেজুরগাছ রয়েছে ২৩ লাখ ৩০ হাজারের বেশি। এর মধ্যে রস সংগ্রহের উপযোগী গাছ ১৩ লাখ ৭ হাজার ১৩০টি। এসব গাছ থেকে মৌসুমে প্রায় ৯৫ লাখ কেজি গুড় উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতি কেজি গুড়ের গড় দাম ২০০ টাকা ধরলে যার বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ শীতের কয়েক মাসের এই ঐতিহ্যবাহী কর্মযজ্ঞ এখন শুধু স্বাদ ও সংস্কৃতির নয়, গ্রামীণ অর্থনীতিরও বড় সম্ভাবনা।
গাছির দা-দড়িতে জেগে উঠছে ঐতিহ্য
খেজুরের রস সংগ্রহের প্রস্তুতি শুরু হয় গাছ পরিচর্যার মধ্য দিয়ে। আশ্বিনের শেষ ভাগ থেকে কার্তিকের শুরুতে গাছিরা খেজুরগাছের শুকনো ডালপালা পরিষ্কার করেন। এরপর গাছের নির্দিষ্ট অংশ চেঁছে নরম শাঁস বের করে দেওয়া হয়। স্থানীয় ভাষায় এ প্রক্রিয়ার নাম ‘গাছ তোলা’ বা ‘গাছ চাঁছা’। গাছের কাটা অংশ শুকিয়ে নেওয়ার পর শুরু হয় রস সংগ্রহের প্রস্তুতি। নির্দিষ্ট স্থানে কাট দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয় মাটির পাত্র— স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘ভাঁড়’ বা ‘ঠিলে’ নামে। রাতভর ফোঁটা ফোঁটা রস জমে সেই পাত্রে। ভোরে গাছ থেকে নামানো হয় মিষ্টি রস।
এরপর শুরু হয় রস জ্বালানোর পালা। উনুনের আগুনে ধীরে ধীরে ঘন হতে থাকা রসের রং বদলায়, ছড়ায় মিষ্টি সুবাস। রসের ঘনত্ব ও প্রস্তুতপ্রণালির ওপর নির্ভর করে তৈরি হয় বিভিন্ন ধরনের গুড়। পরে সেই গুড় ছাঁচে ঢেলে ঠান্ডা করা হলে জমাট বাঁধে পাটালি। খেজুরের গুড়ের সঙ্গে দুধ, চালের গুঁড়া ও নারকেলের মিশেলে তৈরি পিঠা-পায়েশ হয়ে ওঠে শীতের অন্যতম আকর্ষণ।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় যেমন আছে গাছির দক্ষতা ও শ্রম, তেমনি আছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা লোকজ জ্ঞান। তবে সময়ের পরিবর্তনে খেজুরের গুড় তৈরির এই ঐতিহ্য এখন নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ারও খুলছে।
চার মাসের পরিশ্রমে লাখ টাকা লাভের আশা
কৃষিকাজে উৎপাদন খরচ বাড়ায় অনেক কৃষক এখন বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছেন। তাদের কাছে শীত মৌসুমে খেজুরগাছের পরিচর্যা ও রস সংগ্রহ হয়ে উঠছে বাড়তি আয়ের সম্ভাবনাময় উৎস।
যশোর সদর উপজেলার পতেঙ্গালী গ্রামের গাছি টিপু সুলতান ও বলাডাঙ্গা গ্রামের গাছি পশুপতি সরকার জানান, ধান, পাট ও সবজি চাষে পরিশ্রমের তুলনায় লাভ কমে গেছে। অন্যদিকে, শীতকালে নিজের গাছের পাশাপাশি অন্যের খেজুরগাছ ভাগে নিয়ে রস ও গুড় উৎপাদন করলে ভালো আয় করা সম্ভব।
তাদের হিসাব অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে ২০ থেকে ২৫ মণ ধান উৎপাদন হয়। সেই ধান বিক্রি করে ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকা পাওয়া গেলেও সেচ, সার, চারা, শ্রমিক, কাটা ও মাড়াইসহ উৎপাদন খরচ হয় ২৫ হাজার টাকার বেশি। ধান উৎপাদনে সময় লাগে প্রায় চার মাস। অথচ শীত মৌসুমে ১০০টি খেজুরগাছের পরিচর্যা করে রস ও গুড় বিক্রিতে চার মাসে লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ হতে পারে।
গাছিরা বলেন, খেজুরগাছের পরিচর্যা, রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরিতে শ্রম কম নয়। রাতের অন্ধকারে গাছে ওঠা, ভোরে রস নামানো এবং দিনের বড় একটি সময় গুড় তৈরিতে ব্যয় করতে হয়। তারপরও তুলনামূলক ভালো আয়ের আশায় প্রতিবছর তারা এই পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। তাদের প্রত্যাশা, খেজুরের গুড়ের ন্যায্য দাম নিশ্চিত হলে গাছিরা আরও উৎসাহিত হবেন এবং হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যও টিকে থাকবে।
জিআই স্বীকৃতিতে বাড়ছে সম্ভাবনা
যশোরের খেজুরের গুড় ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। এ স্বীকৃতি যশোরের গুড়ের স্বতন্ত্র পরিচিতি প্রতিষ্ঠা এবং বাজার সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, পরিকল্পিত বিপণন, মান নিয়ন্ত্রণ ও ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে খেজুরের গুড়কে আরও বড় বাজারে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
যশোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. জাহিদুল ইসলাম বিশ্বাস বলেন, যশোরের খেজুরের গুড় এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জিআই পণ্য। আমরা গাছিদের উন্নত ও নিরাপদ উপায়ে রস সংগ্রহের জন্য বিশেষ উঠান বৈঠক করছি এবং নেট বিতরণ করছি।
তিনি বলেন, মাটির কলসের মুখে বিশেষ নাইলন নেট ব্যবহার করে রস সংগ্রহের বিষয়ে গাছিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এতে বাদুড় বা অন্য পাখির মাধ্যমে রস দূষিত হওয়ার ঝুঁকি কমবে। নিরাপদ উপায়ে রস সংগ্রহ নিশ্চিত করা গেলে ক্রেতাদের আস্থা বাড়বে এবং যশোরের খেজুরের গুড়ের সুনাম আরও বিস্তৃত হবে।
জাহিদুল ইসলাম বিশ্বাস আরও বলেন, যশোরের এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে হলে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় নতুন করে বিপুল পরিমাণ খেজুরের চারা রোপণ করা জরুরি।
প্রতিনিধি/এলএ




