সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

নজর কাড়ছে কুলাউড়ার সহস্রভুজা দেবীদুর্গা মন্দির

পুলক পুরকায়স্থ, মৌলভীবাজার
প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৭ পিএম

শেয়ার করুন:

নজর কাড়ছে কুলাউড়ার সহস্রভুজা দেবীদুর্গা মন্দির

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কাদিপুরের শিববাড়ি মন্দির। এই মন্দিরে তপ্তকাঞ্চন বর্ণের সহস্রভুজা দেবীদুর্গা স্থাপিত হয়ে পূজিত হচ্ছে। নয়নাভিরাম নানা কারুকার্য খচিত শৈল্পিক আঁচড় আর চারপাশের নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের নিদর্শন মন্দির।

দুর্গোৎসব এলেই এখানে দেশ-বিদেশের নানা প্রান্ত থেকে আসেন দর্শনার্থীরা। তবে দুর্গোৎসব ছাড়াও বছরজুড়ে শিববাড়িতে মনস্কামনা পূরণে আসেন ভক্তরা।

শিববাড়ির মূল মন্দির প্রাঙ্গণে প্রবেশের পূর্বে দূর থেকে মন্দিরের সুউচ্চ চূড়া দেখা যায়। মন্দিরের প্রবেশ পথে ভৈরব মন্দির ও কিছুটা এগিয়ে গেলে দেখা মেলে মূল মন্দিরটি।

স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, এই মন্দির পূণ্যার্থীদের কাছে একটি তীর্থ স্থান হিসেবে পরিচিত। এখানেই অধিষ্ঠিত রয়েছেন দেবীদুর্গা।

মন্দিরটির রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রধান পূজারি আচার্য্য পুলক সোম জানান, বেশ কয়েক বছর আগে স্বপ্নাদিষ্টে পাওয়া সহস্রভুজা দেবীদুর্গার প্রতিমা নির্মাণ শুরু হয় ২০১৮ সালে নভেম্বর মাসে। কিন্তু গত করোনার সময়ে ধীরগতিতে নির্মাণ কাজ বিলম্ব হয়। চার বছরব্যাপী চলা এই কাজে ২০ জন নির্মাণশিল্পীর মাধ্যমে ২০২২ সালে প্রতিমার কাজ শেষ হয়। এই প্রতিমা নির্মাণে পাথর, সিমেন্ট, রড ও বালু ব্যবহার করা হয়। পাথরের তৈরি প্রায় ২৩ ফুট উঁচু তপ্তকাঞ্চন বর্ণের সহস্রভুজা প্রতিমায় দুর্গাপূজা শুরু হয়।

প্রধান পূজারী স্বল্পভাষী আচার্য্য পুলক সোম ঢাকা মেইলকে বলেন, '২০২২ সালের মহাষষ্ঠীতে তপ্তকাঞ্চন বর্ণের সহস্রভুজা দেবীদুর্গার মূল আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে প্রতিমাটির স্থায়ী প্রতিষ্ঠা হয়। এরপর থেকে এখানে নিয়মিত দেবী দুর্গার পূজা হয়ে আসছে।'

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কাদিপুরের শিববাড়ি মন্দির।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কাদিপুরের শিববাড়ি মন্দির।

কাদিপুর শিববাড়ির ইতিহাস সম্পর্কে লোকমুখে শোনা যায় যে, এই বাড়ির স্বর্গীয় অনঙ্গ কুমার সোম ছিলেন জমিদারবংশীয়। এই বংশের কোন এক বংশধর তাদের দীঘিরপাড়ে বেলগাছের নিচে আসন পেতে নিয়মিত শিবের সাধনা করতেন। শিবের সাধনা করলেও তখনো এ বাড়িতে কোন শিবলিঙ্গ ছিল না। পরে অনঙ্গ কুমার সোমের পুত্র স্বর্গীয় অজিত কুমার সোমের পরবর্তী বংশধর পুলক সোমের তপস্যার ফসল হিসেবে ১৪০৫ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসের ১৮ তারিখ শিবলিঙ্গটি পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, সেই শিবলিঙ্গটি ১৫০ বছর পূর্বেকার। পরে পুরনো মন্দিরটি সংস্কার করে সেখানেই শিবলিঙ্গটি স্থাপন করা হয়।

দৈব শিবলিঙ্গ পাওয়ার খবর মুখেমুখে ছড়িয়ে পড়লে, ধর্মপ্রাণ ভক্তরা শিবলিঙ্গটি দেখতে ভিড় জমাতে থাকেন এই বাড়িতে। সেই থেকে আজ অবধি এই ধারা অব্যাহত আছে এবং এই মন্দিরে প্রতিদিন পূজা অর্চনা, ভোগ ও আরতি হয়ে থাকে।

শিববাড়ির জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি ঘটলে একসময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী জমিদার পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। ফলে প্রায় ৩১ বছর ঘটপূজা তারা করেন। তখন সেই বনেদী পূজা-পার্বণে আকাশছোঁয়া জৌলুস হারিয়ে যায়। তবে এর প্রভাবে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসে একবিন্দু ঘাটতি পড়েনি। ধর্মীয় বিধি-বিধান মেনেই পূজা-পার্বণ অব্যাহত ছিল। পরবর্তীতে ২০০১ সাল থেকে মন্দিরটি আগের জৌলুস ফিরতে শুরু করে- যা আজও চলমান আছে।

এখানে আসা বেশ কয়েকজন পুণ্যার্থী জানালেন, বৃহত্তর সিলেটের মধ্যে কুলাউড়ার কাদিপুর ইউনিয়নের এই মন্দিরটিই সেরা। পূজার সময় ভক্তদের ভিড়ে মুখর হয়ে উঠে ঐতিহাসিক অনিন্দ্যসুন্দর এ মন্দিরটি। এর স্থাপত্যশৈলী শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নয়, বরং মুগ্ধ করবে যে কোনো ধর্মের সৌন্দর্য্যপ্রেমী রুচিশীলদের।

এই প্রসঙ্গে শিববাড়ির বংশধর আচার্য্য পুলক সোম বলেন, 'শাস্ত্রে আছে যে বাড়িতে মায়ের পুজো একবার সুন্দর মতো হয়, একশ’ বছরের ভেতরে সেই বাড়িতে মা আবার ফিরে আসেন।'

প্রতিনিধি/এলএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর