সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

নরসিংদীতে বাবার ত্যাগ ও ভালোবাসার গল্পে সাজানো পূজামণ্ডপ

বাকি বিল্লাহ, নরসিংদী
প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫৭ পিএম

শেয়ার করুন:

নরসিংদীতে বাবার ত্যাগ ও ভালোবাসার গল্পে সাজানো পূজামণ্ডপ

শারদীয় দুর্গোৎসব মানেই আনন্দ, সম্প্রীতি ও সৃজনশীলতার বর্ণিল আয়োজন। প্রতিবছরই দেবী দুর্গার আগমনকে ঘিরে প্রতিমা নির্মাণ ও মণ্ডপসজ্জায় দেখা যায় নানা বৈচিত্র্য। তবে এবার নরসিংদীর বাগবিতান ক্লাবের পূজামণ্ডপে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে জীবনের এক চিরন্তন সম্পর্ক—বাবার সঙ্গে সন্তানের ভালোবাসার বন্ধন।

বাবার ভালোবাসা, ত্যাগ ও সন্তানের প্রতি অকৃত্রিম মমতার নানা দিক ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মণ্ডপের সাজসজ্জায়। প্রচলিত মণ্ডপসজ্জার বাইরে গিয়ে ‘বাবার ভালোবাসা’ থিমে সাজানো এই আয়োজন দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করছে। শৈল্পিক উপস্থাপনায় বাবার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার চিরন্তন গল্প তুলে ধরে প্রশংসা পাচ্ছে ক্লাবটি।

মণ্ডপের বিভিন্ন উপস্থাপনায় উঠে এসেছে সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে বাবার নিরলস পরিশ্রম, নিজের কষ্ট আড়াল করে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার সংগ্রাম এবং প্রতিকূল সময়ে সন্তানকে আগলে রাখার দৃশ্য। একজন বাবার নীরব আত্মত্যাগ ও দায়িত্ববোধের গল্প শিল্পের ভাষায় তুলে ধরেছেন আয়োজকেরা। শিল্পীর নিপুণ কারুকাজে যেন ফুটে উঠেছে দুই শ বছর আগের জীবনযাত্রার চিত্রও।

5b616f71-3f9f-4235-9112-9ab029e0d9db

মণ্ডপ দেখতে এসে অনেক দর্শনার্থী ফিরে যাচ্ছেন শৈশবের স্মৃতিতে। কারও মনে পড়ছে বাবার হাত ধরে প্রথম পথচলার দিন, কারও চোখে ভাসছে বাবার কাঁধে চড়ে পৃথিবী দেখার আনন্দময় মুহূর্ত। আবার কারও মনে জেগে উঠছে দূরে থাকা কিংবা হারিয়ে যাওয়া প্রিয় বাবার স্মৃতি। ফলে নান্দনিক সাজসজ্জার পাশাপাশি আবেগঘন এই থিমও দর্শনার্থীদের মনে দাগ কাটছে।

আয়োজনটির বিশেষত্ব শুধু দৃষ্টিনন্দন উপস্থাপনায় সীমাবদ্ধ নয়; এর মধ্য দিয়ে দেওয়া হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তাও। ব্যস্ত জীবনে অনেক সময় বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যায়। বাগবিতান ক্লাবের এই উদ্যোগ সেই দায়িত্বের কথা নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

আরও পড়ুন

কুমিল্লায় ২৫ কেজি ধানে সাজানো প্রতিমা নজর কাড়ছে, প্রস্তুতিতে ছয় মাস

বাবার ভালোবাসা সব সময় মুখের কথায় প্রকাশ পায় না। কখনো তা প্রকাশ পায় ঘাম ঝরানো পরিশ্রমে, কখনো নীরব ত্যাগে, আবার কখনো সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে নেওয়া কঠিন সিদ্ধান্তে। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানের জীবন সুন্দর করে তোলার এই প্রচেষ্টাই বাবার ভালোবাসাকে অনন্য করে তোলে। মণ্ডপসজ্জার মধ্য দিয়ে সেই না-বলা অনুভূতিই মানুষের সামনে তুলে ধরেছে বাগবিতান ক্লাব।

7ddc5fec-4e1e-48e4-8cb5-5d7777d25b89

ধর্মীয় উৎসবের আবহে পারিবারিক বন্ধন, মানবিকতা ও পারস্পরিক সহমর্মিতার এই বার্তা দুর্গোৎসবে যোগ করেছে ভিন্নমাত্রা। দর্শনার্থীদের কাছে তাই মণ্ডপটি শুধু প্রতিমা দর্শন কিংবা উৎসব উপভোগের জায়গা নয়; বরং নিজের শৈশব, পারিবারিক সম্পর্ক ও বাবার অবদানের কথা স্মরণ করারও উপলক্ষ।

আয়োজকদের প্রত্যাশা, এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সন্তানদের মধ্যে বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ আরও জোরালো হবে। জীবনের শেষ পর্যায়ে কোনো বাবাকে যেন অবহেলা ও একাকিত্বের শিকার হতে না হয়, সে বিষয়েও সচেতনতা তৈরি হবে।

fbd62239-1153-47c4-9601-9d9d52967b57

দেবী দুর্গার বন্দনার পাশাপাশি বাগবিতান ক্লাবের এই আয়োজন যেন মনে করিয়ে দেয়, সন্তানের জীবনে বাবার ভালোবাসা অন্যতম বড় শক্তি। সেই ভালোবাসার ঋণ পুরোপুরি শোধ করা সম্ভব না হলেও যত্ন, সম্মান, সহমর্মিতা ও দায়িত্বশীল আচরণের মধ্য দিয়ে বাবার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা যায়।

5412a99a-120d-4ac7-b5b1-7a1aa45d3bc0

বাগবিতান ক্লাবের কোষাধ্যক্ষ সুব্রত কুমার সাহা বলেন, “গত বছর দুর্গাপূজা শেষ হওয়ার পর থেকেই আমাদের ক্লাবের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে মণ্ডপের মূল থিম কী হবে, তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করি। অনেক চিন্তাভাবনার পর আমরা ‘বাবার ভালোবাসা’ থিমটি গ্রহণ করি। প্রথম দিকে বিষয়টি নিয়ে কিছুটা দ্বিধা থাকলেও পরে অনেকে এর মধ্যে ভিন্নতা খুঁজে পান। ধীরে ধীরে সবাই থিমটি গ্রহণ করেন।”

তিনি আরও বলেন, “গত এক মাস ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের এই থিম নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে মণ্ডপসজ্জার কাজ শেষ করে যখন এটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, তখন আমরা আমাদের আয়োজনের সার্থকতা অনুভব করি। একজন বাবা সন্তানের জন্য কতটা অক্লান্ত পরিশ্রম করেন এবং নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে কীভাবে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন, শিল্পী তার শৈল্পিক ছোঁয়ায় সেই চিত্রই অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

e2f4e41e-ee96-42a1-8fe2-284d7f4c22bb

নরসিংদী পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ও সাংবাদিক মাখন দাস বলেন, “উৎসবের আমেজে বাগবিতান ক্লাবের আয়োজন সত্যিই ব্যতিক্রমী। দর্শনার্থীদের জন্য এটি একটি ভিন্নধর্মী উপস্থাপনা, যা প্রশংসার দাবি রাখে। উৎসবের আবহে তারা যেভাবে পারিবারিক সম্পর্ক ও বন্ধনের দৃশ্য তুলে ধরেছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। শিল্পী তার শৈল্পিক ছোঁয়ায় মণ্ডপসজ্জার মাধ্যমে পারিবারিক বন্ধনের দৃঢ়তা ও সৌন্দর্য অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।”

তিনি আরও বলেন, “তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পারিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় করতে এমন আয়োজনের জন্য আমি ক্লাব কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাই।”

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর