উচ্চশিক্ষা শেষ করেও মেলেনি চাকরি। তবে থেমে যাননি ফাতেমাতুজ্জোহরা জেমি। বিকল্প কর্মসংস্থানের পথ খুঁজতে শুরু করেন নকশি কাঁথা তৈরির কাজ। প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজটি শুরু করেন ছোট পরিসরে। এখন তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন ১০০ জন নারী। তাদের শ্রম ও দক্ষতায় তৈরি হচ্ছে নকশি কাঁথাসহ বিভিন্ন ধরনের কারুশিল্পের পণ্য। নারী কর্মীদের পারিশ্রমিক দেওয়ার পর মাসে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা লাভ থাকে জেমির।
৩১ বছর বয়সি এই নারী গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর শহরের বাসিন্দা। তার স্বামী হাসানুল হুদা রাশেদ। জেমি স্নাতকোত্তর শেষ করার পর চাকরির চেষ্টা করেও প্রত্যাশিত সুযোগ না পাওয়ায় নিজেই কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। তার প্রতিষ্ঠানের নাম ‘পুরানলক্ষীপুর এমব্রয়ডারি পল্লী’।
জেমি জানান, প্রায় তিন বছর আগে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) প্রশিক্ষণ নিয়ে নকশি কাঁথাসহ বিভিন্ন ধরনের কারুকাজের পণ্য তৈরির কাজ শুরু করেন। এ উদ্যোগের প্রাথমিক পুঁজি হিসেবে ২০ হাজার টাকা ঋণ পান। সেই অর্থ কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে উদ্যোগটি এগিয়ে নেন। শুরুতে সীমিত পরিসরে কাজ করলেও এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন ১০০ জন নারী।
নকশি কাঁথার প্রতিটি নকশায় থাকে সুঁই-সুতার নিপুণ কাজ। কাপড়ের ওপর ফুল, পাতা, লতাপাতা ও বিভিন্ন নকশা ফুটিয়ে তুলতে প্রয়োজন ধৈর্য ও দক্ষতা। জেমি নিজেও কাজ করেন, পাশাপাশি অন্য নারীদের দিয়ে পণ্য তৈরির কাজ করিয়ে নেন। এতে নারীদের কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নকশি কাঁথার পাশাপাশি থ্রি-পিস, শাড়ি, বালিশের কভার, বিছানার চাদর, পাপোশ ও টেবিল ম্যাটসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরির কাজ করেন তারা। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো গেলে বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
জেমির উদ্যোগে যুক্ত নারীরা নিয়মিত কাজ করেন। তাদের পারিশ্রমিক পরিশোধের পর মাসে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা লাভ থাকে বলে জানান জেমি। তবে পুঁজি সংকটের কারণে চাইলেও ব্যবসার পরিধি বাড়াতে পারছেন না তিনি। নিয়মিত অর্ডার পাওয়া, উৎপাদন খরচ সামলানো এবং পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করাও তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
জেমির প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন গৃহবধূ সিরিনা আক্তার। সংসারের কাজের পাশাপাশি নকশি কাঁথা ও কারুকাজের পণ্য তৈরির কাজ করেন তিনি। সিরিনা আক্তার বলেন, এখানে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। নিজের শ্রমের বিনিময়ে কিছু টাকা আয় করতে পারছি। এই টাকা সংসারের প্রয়োজনে কাজে লাগবে। এখানে কাজ করে আয় করার সুযোগ পেয়ে আমি খুশি।
উদ্যোক্তা জেমি বলেন, চাকরির চেষ্টা করে সফল না হওয়ায় নিজেই কিছু করার উদ্যোগ নিই। তিন বছর আগে প্রশিক্ষণ নিয়ে ২০ হাজার টাকা ঋণের মাধ্যমে নকশি কাঁথার কাজ শুরু করি। তবে পুঁজি কম থাকায় চাইলেও ব্যবসাটি বড় করতে পারছি না। পর্যাপ্ত পুঁজি পেলে আরও বেশি পণ্য তৈরি, নতুন বাজার সৃষ্টি এবং বেশি সংখ্যক নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারব। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা চাই। সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ, পণ্য বাজারজাতকরণ ও বিক্রির সুযোগ পেলে আমার উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নিতে পারব বলে আশা করি।
সাদুল্লাপুর উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা আবু সালেহ মো. সালাউদ্দিন বলেন, সমন্বিত পল্লী দারিদ্র্য দূরীকরণ প্রকল্পের আওতায় গ্রামীণ নারীদের স্বাবলম্বী করতে প্রশিক্ষণ ও ঋণসহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে নারীরা কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারছেন। জেমির উদ্যোগও প্রশংসনীয়।
স্নাতকোত্তর শেষ করে চাকরির সন্ধান থেকে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা জেমির সামনে এখন নতুন লক্ষ্য, নিজের কাজের পরিধি বাড়ানো এবং আরও নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। সুঁই-সুতার নকশায় নিজের স্বপ্নের পাশাপাশি অন্য নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার সম্ভাবনাও বুনছেন তিনি।
প্রতিনিধি/এএইচ



