রোববার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

নিয়ন্ত্রণহীন টমটমে স্থবির ছাগলনাইয়া, বাড়ছে দুর্ঘটনা-ভোগান্তি

নুর উল্লাহ কায়সার, ফেনী
প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩২ এএম

শেয়ার করুন:

নিয়ন্ত্রণহীন টমটমে স্থবির ছাগলনাইয়া, বাড়ছে দুর্ঘটনা-ভোগান্তি

ফেনীর ছাগলনাইয়া পৌর শহরে ব্যাটারিচালিত টমটমের সংখ্যা বাড়তে থাকায় যানজট, সড়কে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। একসময় স্বল্প খরচে যাতায়াতের জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে পরিচিত এই যানবাহন এখন শহরের অন্যতম প্রধান পরিবহন সমস্যায় পরিণত হয়েছে। নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড ও পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় সড়কের ওপর যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এবং অবৈধভাবে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখায় ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী ও ব্যবসায়ীরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত তদারকির অভাবে টমটম চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরছে না। এর সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও পণ্যবাহী যানবাহনের এলোমেলো চলাচল এবং পার্কিং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ছাগলনাইয়া পৌর শহর ও আশপাশের এলাকায় বর্তমানে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার টমটম চলাচল করছে। তবে এ সংখ্যা সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। এসব যানবাহনের জন্য পর্যাপ্ত নির্ধারিত স্ট্যান্ড ও পার্কিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় ছাগলনাইয়া বাজার, জিরো পয়েন্ট, থানা মোড়, হাসপাতাল সড়ক, কলেজ রোড ও সিএনজি স্ট্যান্ড এলাকায় যানজট এখন নিত্য দিনের সঙ্গী হয়ে পড়েছে।

বিশেষ করে অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটির সময় এসব এলাকায় যানজট তীব্র আকার ধারণ করে। কয়েক মিনিটের পথ পাড়ি দিতে কখনো কখনো ২০ থেকে ২৫ মিনিট সময় লাগছে। এতে কর্মজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনে চলাচলকারীরাও ভোগান্তিতে পড়ছেন। যানজটের কারণে অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের গাড়ি আটকে পড়ার ঘটনাও ঘটছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, টমটমের নিবন্ধন ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ, চালকদের প্রশিক্ষণ, নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড স্থাপন, পার্কিং ব্যবস্থাপনা এবং ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এতে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমবে, অন্যদিকে সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি হ্রাস ও শহরের যান চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

852414084_1453026910284062_1900879122799973096_n

বাজার এলাকায় যত্রতত্র টমটম ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানোর কারণে সড়কের বড় একটি অংশ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। এতে যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পথচারীদের চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী আবদুল কাদের বলেন, বাজারের সামনে টমটম ও সিএনজি অটোরিকশা যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলে। এতে রাস্তার অর্ধেক অংশ দখল হয়ে থাকে এবং সারাদিন যানজট লেগে থাকে। এর প্রভাব ব্যবসার ওপরও পড়ছে।

স্কুলশিক্ষার্থী আসিফ জানায়, সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিটের পথ পাড়ি দিতেও কোনো কোনো দিন ২০ থেকে ২৫ মিনিট সময় লাগে। যানজটের কারণে সময়মতো স্কুলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।

টমটমের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পৌর শহর ও আশপাশের এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য ব্যাটারি চার্জিং পয়েন্ট। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার কারণে বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। সন্ধ্যা ও রাতে অনেক এলাকায় ভোল্টেজ কমে যাওয়ার সমস্যাও দেখা দেয়।

ছাগলনাইয়া পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএম জানান, ছাগলনাইয়ায় পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা ২২ থেকে ২৩ মেগাওয়াট। বিপরীতে বরাদ্দ পাওয়া যায় ১৫ থেকে ১৭ মেগাওয়াট। তবে বিদ্যুতের ঘাটতির কতটা টমটমের ব্যাটারি চার্জের কারণে হচ্ছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।

যানজটের পাশাপাশি টমটমের বেপরোয়া গতি ও চালকদের প্রশিক্ষণের অভাব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, অনেক চালক ট্রাফিক আইন না মেনে প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালান। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

গত ৬ আগস্ট ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সমিতি বাজার এলাকায় বাসচাপায় টমটমের যাত্রী ছায়েদুল হক ফনি (৩২) নিহত হন। এ ঘটনায় তার চাচা আলম ও টমটমচালক আহত হন। সম্প্রতি উত্তর পানুয়া এলাকায় দ্রুতগতির টমটমের ধাক্কায় ইসরাত জাহান সাবিরা (৬) নামে এক মাদরাসাশিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়।

846466665_2032053117478802_2978622400657231358_n

রিকশাচালক জাকির হোসেন বলেন, অনেক চালকের বয়স কম এবং তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। কেউ কেউ মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালান বলেও অভিযোগ রয়েছে। যাত্রী নেওয়ার প্রতিযোগিতায় বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, একসময় ছাগলনাইয়া পৌর এলাকায় প্রায় ৬০০টি রিকশা চলাচল করত। এসব রিকশার লাইসেন্স থেকে পৌরসভা উল্লেখযোগ্য রাজস্ব পেত। তবে ব্যাটারিচালিত টমটমের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেক রিকশা চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে অনেক রিকশায় মোটর সংযোজন করে টমটমে রূপান্তর করা হয়েছে।

ছাগলনাইয়া পৌরসভার লাইসেন্স পরিদর্শক জাহাঙ্গীর আনসারী বলেন, একসময় পৌর এলাকায় প্রায় ৬০০ রিকশা চলত। কিন্তু টমটমের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে রিকশাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রিকশায় মোটর লাগিয়ে টমটম তৈরি করা হয়েছে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ট্রাফিক পুলিশ নিয়োগের আবেদন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে থানা পুলিশ।

ছাগলনাইয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবু তাহের বলেন, ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ট্রাফিক পুলিশ নিয়োগের আবেদন করা হয়েছে। জেলা থেকে ট্রাফিক পুলিশ নিয়োগ করা হলে সড়কের বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দা ফারহানা পৃথা বলেন, টমটম চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রশাসন কাজ করছে। নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড, পার্কিং ও রুট ব্যবস্থাপনার বিষয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

প্রতিনিধি/টিবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর