শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

রোবট ও স্মার্ট প্রযুক্তি নিয়ে স্বপ্ন দেখছেন গাইবান্ধার সামিউল

তোফায়েল হোসেন জাকির, গাইবান্ধা
প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪১ পিএম

শেয়ার করুন:

রোবট ও স্মার্ট প্রযুক্তি নিয়ে স্বপ্ন দেখছেন গাইবান্ধার সামিউল

শৈশব থেকেই ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির প্রতি গভীর আগ্রহ। খেলনা কিংবা গৃহস্থালি সামগ্রী কীভাবে কাজ করে, তা জানার কৌতূহল থেকেই শুরু হয় হাতে-কলমে কাজ। সেই আগ্রহ থেকেই এখন পর্যন্ত ১৫০টির বেশি ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্প তৈরি করেছেন গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর তরুণ প্রকৌশলী মো. সামিউল ইসলাম। রোবোটিকস, অটোমেশন ও স্মার্ট প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে তার স্বপ্ন, উদ্ভাবনের মাধ্যমে মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান করা।

সামিউল পলাশবাড়ী উপজেলার মহদীপুর ইউনিয়নের পূর্ব গোপালপুর গ্রামের মো. শফিকুল ইসলাম ও লাইজু বেগম দম্পতির ছেলে।   

স্থানীয় ও স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, সামিউল ছোটবেলায় পাড়া-প্রতিবেশীদের লাইট, ফ্যান ও মসজিদের মাইকের সমস্যা সমাধানের মধ্যদিয়ে তার প্রযুক্তিচর্চার শুরু। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় তৈরি করেন একটি বৈদ্যুতিক নৌকা। এ জন্য মহদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছ থেকে সম্মাননাও পান। পরে আমলাগাছি বিএম উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম ও দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় টানা দুই বছর বিজ্ঞান মেলায় প্রথম স্থান অর্জন করেন।

পলাশবাড়ী সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে সামিউল ভর্তি হন ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তার উদ্ভাবনী কাজের পরিধি বাড়ে। রোবোটিকস, অটোমেশন, ইন্টারনেট অব থিংস ও স্মার্ট সিস্টেম নিয়ে তৈরি করেন ১৫০টির বেশি প্রকল্প।

তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে- সেবা ও পর্যবেক্ষণ রোবট, স্মার্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্মার্ট কৃষি এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের সহায়ক প্রযুক্তি। তার তৈরি রোবট খাবার ও নোটিশ পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি গ্যাস ও আগুন শনাক্ত করে সাইরেন বাজানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে। স্মার্ট কৃষি প্রকল্পে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দূর থেকে সেচব্যবস্থা এবং খামারের আলো ও খাবার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের ধারণা তুলে ধরেছেন তিনি। 

এ ছাড়া শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের যোগাযোগ সহজ করার প্রযুক্তি নিয়েও কাজ করেছেন। তার প্রতিভায় ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস থেকেও প্রজেক্ট কম্পিটিশনে সেকেন্ড পজিশন অর্জন করে অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন।   

উদ্ভাবনী কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে ১০০ শতাংশ টিউশন ফি মওকুফের সুযোগ পান সামিউল। ২০২৫ সালে IEEE BECITHCON-এর প্রকল্প প্রদর্শনী প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান এবং INCON-  ২০২৫-এর ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি শাখায় দ্বিতীয় রানার-আপ হন তিনি।

বর্তমানে সামিউল খুলনা টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে (টিটিসি) ইলেকট্রিক্যাল ট্রেডে অতিথি প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি তরুণদের হাতে-কলমে কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ করে তুলতে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘Engineering BD’। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

বাংলাদেশে প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতা নিয়ে সামিউল ইসলাম বলেন, একটি দেশ কতটা উন্নত, তা শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে না; বরং নিজেদের কতটুকু নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ক্ষমতা আছে, সেটাই আসল। আমাদের তরুণদের মেধার অভাব নেই। তবে আধুনিক গবেষণাগার, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সহজলভ্যতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের অভাব বড় বাধা।

সামিউল আরও বলেন, উদ্ভাবনকে শুধু বিজ্ঞান মেলা বা প্রদর্শনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কৃষি, শিক্ষা, শিল্প ও মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে কাজে লাগানো। এর পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও গবেষণার সুযোগ বাড়লে তরুণ উদ্ভাবকরা দেশের প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রায় আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।

পলাশবাড়ীর আমলাগাছী ভূবন মোহন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মাজেদ সরকার বলেন, আমরা তার স্কুলজীবন থেকেই ব্যবহারিক কাজের প্রতি গভীর আগ্রহ দেখে আসছি। বিভিন্ন ধরনের প্র্যাকটিক্যাল কাজ করার প্রতি তার বিশেষ ঝোঁক রয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, তার এই আগ্রহ ও উদ্ভাবনী প্রচেষ্টা ধীরে ধীরে দেশের মানুষের কল্যাণে কাজে আসবে।

খুলনা টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের (টিটিসি) অধ্যক্ষ মো. জিয়াউর রহমান বলেন, সামিউলের দক্ষতা বাড়াতে আমরা তাকে ট্রেডমাস্টার রোবট তৈরির জন্য অর্থায়ন করেছি। পাশাপাশি তাকে উৎসাহ দিয়েছি, যাতে সে নিজের দক্ষতা আরও বাড়াতে পারে।

প্রতিনিধি/এলএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর