শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

সাংবাদিক আলিফ হত্যা: ‘মা, কেঁদো না, বাবা আকাশের স্টার হয়ে গেছে'

সাইফুল আরিফ জুয়েল, নেত্রকোনা
প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৮ পিএম

শেয়ার করুন:

সাংবাদিক আলিফ হত্যা: ‘মা, কেঁদো না, বাবা আকাশের স্টার হয়ে গেছে'
মায়ের কোলে নিহত সাংবাদিক আলিফের শিশু কন্যা। ছবি: ঢাকা মেইল

‘মা, কেঁদো না। বাবা আকাশের স্টার হয়ে গেছে। কয়েক দিন পরেই আমাদের কাছে চলে আসবে।’ বাবাকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙেপড়া মাকে এভাবেই সান্ত্বনা দেয় চার বছরের ছোট্ট প্রান্থি। বাবা যে আর কোনো দিন ফিরবেন না- সেই বোধটুকু এখনো হয়নি তার। অথচ মায়ের চোখের পানি দেখে মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে অবুঝ শিশুটি।

মেয়ে প্রান্থির মুখে এমন কথা শুনে বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট আর ধরে রাখতে পারেন না আনন্দিতা সাংমা। কান্না আরও বেড়ে যায় তার। যে মেয়েটির এখন বাবার কোলে চড়ে বেড়ানোর কথা, সেই মেয়েই কিনা বাবাকে হারিয়ে কাঁদতে থাকা মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে! এই দৃশ্য যেন তার কষ্টকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

আনন্দিতা বলেন, মেয়ের মুখে এসব কথা শুনলে বুকটা ফেটে যায়। বাবা যে আর কোনো দিন ফিরে আসবে না, তা বোঝার বয়স এখনো হয়নি তার। ওর কথা শুনে আমার কান্না দ্বিগুণ হয়ে যায়।

প্রান্থির বয়স মাত্র চার বছর। ছোট ভাই আইয়ান সাফয়ানের দেড় বছর। বাবার মৃত্যুর অর্থ বোঝার বয়স হয়নি তারও। তবে দুই দিন ধরে বাবাকে কাছে না পেয়ে কেঁদে অস্থির হয়ে উঠছে সে। বাবা ডাকতে শিখেছে, কিন্তু সেই বাবা যে আর কোনো দিন সাড়া দেবেন না, তা বোঝার ক্ষমতা এখনো হয়নি তার। বাবার স্নেহ-আদর থেকে বঞ্চিত হওয়ার গভীরতা বুঝতে না পারলেও বাবাকে না পাওয়ার কষ্ট যেন ঠিকই অনুভব করছে ছোট্ট আইয়ান।

এই দুই অবুঝ শিশুকে নিয়েই এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে আনন্দিতা। স্বামীকে হারানোর শোকের পাশাপাশি সন্তানদের কীভাবে বড় করবেন, কীভাবে তাদের বাবার অভাব পূরণ করবেন— সেই দুশ্চিন্তা তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

শনিবার দুপুরে নেত্রকোনার দুর্গাপুরের তেলুঞ্জিয়া গ্রামে নিহত সাংবাদিক আলিফের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে দেখা যায়- স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা মেয়েকে কোলে নিয়ে কান্না করছেন। তাকে সান্তনা দিতে জড়ো হয়েছেন প্রতিবেশীরা। বাড়িতে এসেছেন আলিফের বোনেরাও। তখন মেয়েকে কোলে নিয়ে এসব কথা বলেন আনন্দিতা।

আনন্দিতা সাংমা বলেন, বাবাহীন ছোট ছোট ছেলে-মেয়েকে নিয়ে আমি কীভাবে মানুষ করব? আলিফ ছেলে-মেয়েকে খুব ভালোবাসত, অনেক আদর করত। ওরা তো আর কোনো দিন বাবার আদর পাবে না। যারা আমার সন্তানদের এতিম করেছে, বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত করেছে, আমি তাদের কঠিন শাস্তি দেখতে চাই। হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার করা হোক।

স্বামী আলিফ ফকিরের হত্যাকাণ্ডের পেছনে তার লেখালেখির বিষয়টিও সামনে এনেছেন আনন্দিতা। তার ভাষ্য, আলিফ অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে লেখালেখি করতেন। মুঠোফোনে বাসায় কথা বলার সময় এসব বিষয়ে আলোচনা শুনেছেন তিনি। তখন বুঝতে পেরেছেন, আলিফকে অনেকে হুমকি দিতেন।

সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার বাসিন্দা। তিনি দুর্গাপুর উপজেলার তেলুঞ্জিয়া গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে স্ত্রী আনন্দিতা সাংমার সঙ্গে থাকতেন। তাদের চার বছরের মেয়ে প্রান্থি ও দেড় বছরের ছেলে আইয়ান সাফয়ান রয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৮টার দিকে তেলুঞ্জিয়া গ্রামে শ্বশুরবাড়ি থেকে কয়েক গজ দূরে একটি দোকানের পাশে সাংবাদিক আলিফকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। মাথা, গলা ও বুকে ছয়টি গুলি লাগে তার। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় শুক্রবার রাতে আনন্দিতা সাংমা দুর্গাপুর থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আটজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। তবে ঘটনার দুই দিন পেরিয়ে গেলেও হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

আলিফের বড় ভাই শহীদুল ইসলাম ফকির বলেন, আলিফ অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন ছিল। সীমান্ত এলাকার মাদক-চোরাচালান, চাঁদাবাজি, অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে লিখত। এর জেরেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। 

আলিফের বড় বোন কল্পনা আক্তার বলেন, আমরা এই হত্যার বিচার চাই। আলিফ অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে লিখত, অন্যায়ের সাথে আপস করত না। তাই তাকে হত্যা করেছে। তার ছোট ছোট ছেলে মেয়েকে নিয়ে স্ত্রী অসহায় হয়ে পড়েছে। সরকারের কাছে দাবি- হত্যাকারীদের বিচারের পাশাপাশি আলিফের স্ত্রী সন্তানদের সহায়তা করা হোক। তার স্ত্রী নার্সিংয়ে পড়াশোনা করেছে, তাকে চাকরির ব্যবস্থা করে দিলে ছেলেমেয়েকে মানুষ করে গড়ে তুলতে পারবে। 

জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) হাফিজুল ইসলাম বলেন, সাংবাদিক  আলিফ হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি গুরুত্বসহ তদন্ত করা হচ্ছে। জড়িতদের গ্রেফতারে পুলিশ, এসআরবিসহ একাধিক সংস্থা কাজ করছে। দ্রুতই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেফতার করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

প্রতিনিধি/এলএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর