- ৬৩ শিক্ষকের মাঝে কর্মরত ১৮ জন, ৯৯ কর্মচারী পদের শূন্য ৭৪ পদ!
- ৫ বছর যাবৎ বেতনভাতা পাচ্ছেন না সমাপ্ত প্রকেল্পর ১৩ শিক্ষক
- অর্থের অভাবে মাটি ভরাট করে প্রস্তুুত করা যায়নি খেলার মাঠ
- ২ একরের ক্যাম্পাস ও আবাসিকে নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থা
- যাত্রী ছাউনী নির্মাণের আশ্বাস দিয়েও প্রকল্প দেয়নি জেলা পরিষদ
২০০৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের একমাত্র আইসিটি নির্ভর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ‘ফেনী কম্পিউটার ইনস্টিটিউট’। এক সময়ে এ প্রতিষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আইসিটি বিষয় শেখার জন্য শিক্ষার্থীদের ভীড় থাকলেও এখন তেমন ভিড় দেখা যাচ্ছেনা।
এখানে নেই প্রয়োজনীয় শিক্ষক, নেই কর্মকর্তা-কর্মচারী। এখনও শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরী করা যায়নি খেলাধুলার মাঠ। ৬৩ জন শিক্ষকের পদ থাকলেও মাত্র ১৮ জন দিয়ে কোনরকম পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে নেয়া হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ এ ইনস্টিটিউটে। বছরের পর বছর প্রতিষ্ঠানটি সংকট থেকে উঠতে না পারায় বিশেষত্ব হারাতে বসেছে এশিয়া মহাদেশের একমাত্র আইসিটি নির্ভর প্রতিষ্ঠানটি।
তবে জনবল নিয়োগ, অবকাঠামোগত সংস্কার করা হলে প্রতিষ্ঠানটি খালেদা জিয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাড়াতে পারবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। খালেদা জিয়ার সন্ত্রান তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার পর সেই আশায় বুক বেঁধেছেন তারা।
জানা যায়, ফেনী শহরতলীর রানীরহাটের পশ্চিম পাশে ২ একর ভূমির উপর ২০০৩ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হয় ফেনী কম্পিউটার ইনস্টিটিউটের। ২০০৬ সালের ৭ জুন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইনস্টিটিউটটির উদ্বোধন করেন। ওই বছরই এ প্রতিষ্ঠানে সর্বপ্রথম ডেটা টেলিকমিউনিকেশন অ্যান্ড নেটওয়ার্কিং টেকনোলজি এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির উপর ৪ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হয় শিক্ষার্থীরা। পরে এ প্রতিষ্ঠানে টেলিকমিউনিকেশন টেকনোলজিতে ডিপ্লোমা চালু করা হয়। ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর চাপ বেশি থাকায় এক পর্যায়ে এ প্রতিষ্ঠানে দ্বিতীয় শিফট চালু করা হয়।

এ প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা বর্তমানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আইসিটি সেক্টরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। অনেকেই উদ্যোক্তা হয়ে দেশের ডিজিটাল কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সরকারের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন। দেশের আইসিটি সেক্টর এগিয়ে নিতে এ প্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষার্থীরা কর্মজীবনে ব্যাপক ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানে ৩টি বিষয়ে ৪ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্সে ১২০০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।
মূল ক্যাম্পাসে পাঁচতলা বিশিষ্ট একটি ভবন রয়েছে। যেখানে শ্রেণিকক্ষ, লাইব্রেরি, আধুনিক যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ ওয়ার্কশপ রুম, এবং ল্যাবরেটরী, কম্পিউটার ল্যাবরেটরি কার্যক্রম রয়েছে। এখানে প্রতি বছর প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। এছাড়াও এখানে ১২০ আসন বিশিষ্ট ৫ তলার একটি ছাত্র আবাসিক হল ও ৮০ শয্যার ৪ তলা বিশিষ্ট ছাত্রী আবাসিক হল রয়েছে। এর বাইরে একটি প্রশাসনিক ভবন রয়েছে এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানে ৬৩ জন শিক্ষকের মাঝে কর্মরত রয়েছে মাত্র ১৮ জন শিক্ষক। শূন্যপদ রয়েছে ৪৫টি, তারমধ্যে ২ জন উপাধ্যক্ষের পদই শূন্য। চিফ ইন্সট্রাক্টরের ১০ পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ২ জন। ২৬ জন ইন্সট্রাক্টর থাকার জায়গাতে আছে ৫ জন। জুনিয়র ইন্সট্রাক্টরের ২৬টি পদ থাকলেও কর্মরত মাত্র ১১ জন।
শুধু তাই নয়; বিশেষায়িত এ প্রতিষ্ঠানে ৯৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাঝে মাত্র ২৫ জন দিয়েই চালানো হচ্ছে। বছরের পর বছর শূণ্য অবস্থায় পড়ে আছে ৭৪টি পদ। তারমধ্যে ক্রাফট ইন্সপেক্টরের ৬৮ পদের মাঝে কর্মরত আছেন মাত্র ১০ জন। পোস্ট থাকলেও বছরের পর বছর পদায়িত হননি মেডিক্যাল অফিসার, ফার্মার্সিস্ট, হিসাব রক্ষক, স্টোর কিপার, ড্রাফটম্যান, অফিস সহকারী, ক্যাশ সরকার, সহকারী বাবুর্চি, বুক সর্টার, গার্ডেনার।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, ফেনী কম্পিউটার ইনস্টিটিউটে ২০১২ সালে শুরু হওয়া স্কিলস ফর ইমপ্লিমেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (এসইআইপি) প্রজেক্টটি ২০১৯ সালে শেষ হলে ১৫ জন শিক্ষককে কলেজে সংযুক্ত করা হয়। ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত তাদের বেতন-ভাতাও পরিশোধ করা হয়। কিন্তুু এরপর থেকে দীর্ঘ ৬ বছর যাবৎ তাদের বেতন ভাতা পরিশোধ করা হচ্ছে না। কলেজ থেকে যৎসামান্য তাদের দেওয়া হলেও এতে যাতায়াত ভাতাও হচ্ছে না। ইতোমধ্যে ২ জন শিক্ষক হাল ছেড়েছেন। বাকী ১৩ শিক্ষক এখনও প্রতিষ্ঠানটির মায়া ছাড়তে না পেরে মানবেতর জীবন যাপন করছে।
এদিকে কলেজের নামে ২ একর ভূমি সড়ক ও জনপথ বিভাগ থেকে দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কবুলিয়ত দলিল হয়নি। অধ্যয়নরত ১২শ শিক্ষার্থীর জন্য খেলার মাঠ প্রস্তুত করতে আরও এক একর জমি বন্দোবস্ত হলেও বরাদ্দের অভাবে সেটিও পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। এছাড়াও কলেজটি প্রতিষ্ঠার দেড়যুগ হলেও এখন পর্যন্ত কলেজের সামনে নির্মাণ করা যায়নি যাত্রী ছাউনি। যার কারণে রোদ, বৃষ্টির সময় শিক্ষার্থীরা পরিবহনের জন্য অপেক্ষা করতে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
কলেজ কর্তৃপক্ষ জানায়, দেশের বিশেষায়িত আইসিটি নির্ভর এ প্রতিষ্ঠানটিতে একদিকে সমস্যাগুলো দীর্ঘ হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। তুলনামূলক শিক্ষক থাকা এবং চাহিদা থাকার পরও ২০২০-২০২১ শিক্ষা বর্ষ থেকে ডেটা, টেলিকমিউনিকেশন অ্যান্ড নেটওয়ার্কিং টেকনোলজিতে শিক্ষার্থী ভর্তি নেয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। কলেজটিতে ইলেকট্রিক্যাল টেকনোলজি ও সিভিল টেকনোলজি চালু করতে পারলে শিক্ষার্থীদের কাছে প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্ব আরও বাড়তো।
কলেজের ৭ম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান বলেন, ফেনী কম্পিউটার ইনস্টিটিউটে সমস্যার অন্ত নেই। শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী সংকটের পাশাপাশি কলেজটিতে গভীর নলকূপ না থাকায় সুপেয় পানির সংকট রয়েছে। কলেজের সামনেই ফেনী-ছাগলনাইয়া সড়ক। এ সড়কে কলেজের শতশত শিক্ষার্থী নিয়মিত যাতায়াত করে। দীর্ঘক্ষণ পরিবহনের জন্য শিক্ষার্থীরা রাস্তার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু রাস্তার পাশে যাত্রী ছাউনি না থাকায় বৃষ্টি ও রোদের সময় কষ্টের সীমা থাকে না। এখানে সহস্রাধিক শিক্ষার্থী থাকলেও খেলাধুলার কোনো মাঠ নাই। যার কারণে শিক্ষার্থী ও আবাসিকে থাকা ছাত্রছাত্রীদের মাঝে ক্রীড়া বিমুখীতা সৃষ্টি হচ্ছে। এ ছাড়াও ১২শ শিক্ষার্থীর এ কলেজে মাত্র ১৩০ জন আবাসিকে থাকার সুযোগ পেয়েছে। আবাসিকে সিট না পাওয়ায় শিক্ষার্থীরা আশপাশে বিভিন্ন ম্যাস ভাড়া ও মানুষের বাড়িতে থেকে নিরাপত্তাসহ নানা সমস্যায় পতিত হচ্ছে।
ফেনী জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল জানান, ফেনীতে বেগম জিয়ার হাতে গড়া সবগুলো প্রতিষ্ঠানই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তন্মধ্যে ফেনী কম্পিউটার ইনস্টিটিউট অন্যতম। প্রতিষ্ঠানটি বেগম জিয়ার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অগ্রাধিকারভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। এই প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্বের অন্যতম একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার আগ্রহ ছিলো খালেদা জিয়ার। কিন্তু পরবর্তী সরকার শুধুমাত্র বেগম খালেদা জিয়ার হাতে তৈরি হওয়া বলেই প্রতিষ্ঠানটিকে গুরুত্বহীন করে দেয়। এখানে প্রয়োজনীয় শিক্ষক-কর্মচারী দেওয়া হয়নি। নতুন কোনো অবকাঠামোও গড়ে ওঠেনি। আমরা আশা করি বেগম খালেদা জিয়ার হাতে গড়া এ বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ব বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার জন্য বর্তমান সরকার কাজ করে যাবে।
ফেনী কম্পিউটার ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ প্রকৌশলী প্রদীপ্ত খীসা বলেন, ২০০৬ সালের ৭ জুন কলেজটির উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তখন এটি বাংলাদেশের একমাত্র আইসিটি নির্ভর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিলো। সরকার এটিকে পুরো পৃথিবীর জন্য একটি মডেল প্রতিষ্ঠান করার প্রচেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু কালের পরিক্রমায় ২১ বছরে তার অগ্রগতি সেভাবে হয়নি। বর্তমানে অপ্রতুল শিক্ষক-কর্মচারী, অবকাঠামো নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কোনোরকম চালিয়ে নেয়া হচ্ছে। তবে আমরা বর্তমানে খুবই আশাবাদী, বর্তমানে বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য সন্তান তারেক রহমান এ দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন। তার সু-দৃষ্টি এবং সহানুভূতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির যাবতীয় সমস্যা সমাধান হয়ে এটি একটি আন্তর্জাতিক মানে মডেল পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সারা বাংলাদেশে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।
প্রতিনিধি/এমএইচআর




