মহাষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে আজ থেকে রাজবাড়ী জেলাজুড়ে শুরু হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। এ বছর জেলার ৫টি উপজেলায় মোট ৪৬৪টি মন্দিরে পূজার আয়োজন করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ২১টি বেশি।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) ভোর থেকেই বিভিন্ন পূজা মণ্ডপে চণ্ডীপাঠ, ঢাকের আওয়াজ আর কাঁসরের শব্দে মুখরিত হয়ে উঠেছে রাজবাড়ীর পরিবেশ। ভক্তরা দেবী দুর্গার আবাহনে মন্দিরে মন্দিরে ভিড় করতে শুরু করেছেন।
উৎসবকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দিন ধরেই জেলার মন্দিরগুলোতে চলেছে ব্যস্ত সময়। সিংহভাগ মণ্ডপেই প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। শেষ সময়ে প্রতিমা শিল্পীদের নিপুণ হাতের রং-তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠেছে দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের রূপ।
মন্দিরগুলোর আঙিনা ও আশপাশের এলাকায় সুদৃশ্য প্যান্ডেল, তোরণ এবং আলোকসজ্জার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আলোঝলমলে পরিবেশ দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করছে।
পূজা শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও আনন্দমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত করতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কড়া নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
পুরান মতে, অকালবোধনে নিদ্রিত দেবীকে জাগ্রত করার এই শাস্ত্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে আজ শুক্রবার মহাষষ্ঠীর অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হবে শারদীয় দুর্গোৎসব। এদিন মহাষষ্ঠীর আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে শুরু হবে দেবী দুর্গার বোধন ও পূজা-অর্চনা। প্রচলিত নিয়মে দুর্গাপূজা মূলত মহাষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত পাঁচদিন ধরে উদযাপিত হয়। তবে এ বছর মহাসপ্তমীর তিথি দু-দিন পড়ায় শারদীয় দুর্গাপূজা একদিন বেড়ে চলবে ৬ দিন ধরে। এ হিসাবে আগামী শনিবার মহাসপ্তমী, রোববার মহাসপ্তমী(অধিক পূজা), সোমবার মহাষ্টমী ও কুমারী পূজা এবং মঙ্গলবার মহানবমী শেষে বুধবার বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে ছয় দিনের শারদীয় দুর্গোৎসব।
গত ১০ই অক্টোবর হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মহালয়া উদযাপন করেছেন। যা দেবী দুর্গার আগমনের বার্তা বয়ে আনে। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস ও পঞ্জিকা অনুযায়ী, জগতের কল্যাণ কামনায় এবার ঘোড়ায় চড়ে মর্ত্যে আসবেন দেবী দুর্গা। পূজা শেষে নৌকায় চড়ে স্বর্গলোকে ফিরে যাবেন তিনি। এদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাহী আদেশে এবার দুর্গাপূজার ছুটি তিন দিন করেছে সরকার। সাপ্তাহিক শুক্র ও শনিবারের ছুটির সঙ্গে এ ছুটি যুক্ত হওয়ায় ২০ থেকে ২৪শে অক্টোবর পর্যন্ত টানা ৫দিন ছুটি উপভোগ করবেন সংশ্লিষ্টরা। হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে এই দুর্গোৎসবটি গভীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য বহন করে। এটি অসুররাজ মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবী দুর্গার বিজয়কে স্মরণ করিয়ে দেয় এবং অশুভ শক্তির ওপর শুভ শক্তির জয়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
হিন্দু পুরান অনুযায়ী, মহিষাসুর এমন এক বর লাভ করেছিলেন, যার ফলে কোনো পুরুষের হাতে তার মৃত্যু ছিল অসম্ভব। এ ক্ষমতার বলে তিনি দেবতাদের জন্য হুমকি হয়ে ওঠেন। তখন দেবতারা তাদের সম্মিলিত ঐশ্বরিক শক্তির মাধ্যমে দেবী দুর্গাকে সৃষ্টি করেন, যিনি মহিষাসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত তাকে পরাজিত ও বধ করেন। দুর্গাপূজা শুধু একটি প্রধান ধর্মীয় উৎসব হিসেবেই নয়, বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও উদযাপিত হয়। এ উৎসব হিন্দু সম্প্রদায় ও অন্যান্য ধর্মের মানুষকে একত্রিত করে, যা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঐতিহ্যকেই তুলে ধরে।
রাজবাড়ী জেলায় মোট ৪৬৪টি পূজা মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে রাজবাড়ী সদর উপজেলায় (পৌরসভা সহ) ১১৯টি, গোয়ালন্দ উপজেলায় (পৌরসভাসহ) ২৬টি, বালিয়াকান্দি উপজেলায় ১৬০টি ও পাংশা উপজেলায় (পৌরসভা সহ) ১০৪টি ও কালুখালীতে ৫৫টি পূজা মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।
পুলিশ সুপার মীর মনির হোসেন বলেন, শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে উদযাপনে পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট, বিজিবি, আনসার, এসআরবি, স্ট্রাইকিং ফোর্স ও মন্দির কমিটির স্বেচ্ছাসেবকেরা দায়িত্ব পালন করছেন। পূজামন্ডপের নিরাপত্তায় বাইক পার্টি, গোয়েন্দা সদস্য ও সাদা পোশাকের পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এবার ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও পূজা কমিটির সদস্যদের সমন্বয়ে যানবাহন ও জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে পূজা উপভোগ করতে পারেন।
প্রতিনিধি/ এজে




