বর্ষার পানি কমতে শুরু করতেই সিরাজগঞ্জের চলনবিলে বেড়েছে শামুক-ঝিনুক আহরণ। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন শতাধিক নৌকায় প্রায় ২ থেকে ৩ টন শামুক সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব শামুক দেশের বিভিন্ন জেলার মাছ ও হাঁসের খামারে খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাবে, বর্ষা মৌসুমের তিন থেকে চার মাসে এ বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় কোটি টাকা। দরিদ্র মানুষের জীবিকার সুযোগ তৈরি হলেও নির্বিচারে শামুক আহরণে চলনবিলের জলজ জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, চলনবিলে শামুক সংগ্রহ এখন অনেক মানুষের মৌসুমি জীবিকা। বর্ষায় কৃষিকাজ ও অন্যান্য কাজের সুযোগ কমে গেলে তারা নৌকা নিয়ে বিলে নামেন। তাড়াশের হামকুড়িয়া, ঘরগ্রাম ও কুন্দইলসহ প্রায় ২২ থেকে ২৫টি এলাকায় জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ছোট ডিঙি নৌকায় শামুক সংগ্রহ চলে। এ কাজে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা নৌকা ও অন্যান্য সহযোগিতা দেন।

সংগ্রহকারীদের তথ্য অনুযায়ী, একজন শ্রমিক দিনে তিন থেকে চার বস্তা শামুক সংগ্রহ করতে পারেন। প্রতি বস্তা বিক্রি হয় ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। সব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ থেকে ৩ টন শামুক সংগ্রহ করা হয় বলে স্থানীয়দের দাবি। চলনবিলের শামুক স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কুষ্টিয়া, নোয়াখালী, বরিশাল, যশোর ও খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়। সেখানে শামুক প্রক্রিয়াজাত করে মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাবে, এবার পানি দেরিতে নামায় আহরণের মৌসুম আরও এক মাস বাড়তে পারে। এতে বিলের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শামুক সংগ্রহকারী সংকর চক্রবর্তী বলেন, বর্ষার মৌসুমে কৃষিকাজ বা অন্য কোনো কাজ তেমন থাকে না। তখন সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। জীবিকার তাগিদে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহায়তা নিয়ে শামুক সংগ্রহ শুরু করেছেন তিনি। প্রতিদিন এ কাজ করে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। সেই টাকা দিয়েই কোনো রকমে সংসার চালাতে হয় তাকে।

মাগুড়া বিনোদ ইউনিয়নের কুন্দইল গ্রামের জেলে ও শামুক সংগ্রহকারী রফিকুল, পলাশ, পরাণ ও সাগর শেখ জানান, ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত বিভিন্ন জলাশয়ে ঘুরে তারা শামুক সংগ্রহ করেন। মাঠে কাজের সুযোগ কম থাকায় বাধ্য হয়ে এ পেশায় যুক্ত হয়েছেন। দিন শেষে শামুক বিক্রির টাকা দিয়ে পরিবারের খাবারের ব্যবস্থা করতে হয় তাদের। তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করেও সংসারের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় জীবিকার তাগিদে এ কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

স্থানীয় শামুক সংগ্রহকারী কাদের মোল্লা বলেন, বর্ষায় চাষাবাদ বন্ধ থাকায় তাদের হাতে কাজ থাকে না। তখন শামুক ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় নৌকা নিয়ে বিলে নামেন। সারাদিন পরিশ্রম করে যা আয় হয়, তা দিয়েই সংসার চলে। অন্য কাজের সুযোগ কম থাকায় বর্ষা মৌসুমে এ আয় তার পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
নাদোসৈয়দপুর এলাকার শামুক ব্যবসায়ী আলামিন শেখ, কামাল হোসেন ও লিটন মিয়া জানান, এ বছর তাড়াশ, নওগাঁ ও পাবনা এলাকার কয়েকটি ইউনিয়নের সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে শামুক কেনা হচ্ছে। তাদের হিসাবে, কয়েকটি ব্যবসায়ী দল মিলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮০ থেকে ১০০ মণ শামুক কেনে। প্রতি কেজি শামুকের ক্রয়মূল্য প্রায় সাত টাকা। সংগ্রহ করা শামুক বিভিন্ন আড়তে পাঠানো হয়। পরে সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করে মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ ব্যবসার সঙ্গে শামুক সংগ্রহকারী, পরিবহন শ্রমিক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরাও যুক্ত।

স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল মমিন বলেন, ছোট-বড় মিলিয়ে ২২ থেকে ২৫ জন ব্যবসায়ী এ কাজে জড়িত। তারা সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে শামুক কিনে দেশের বিভিন্ন জেলার আড়তে পাঠান। তার দাবি, বর্ষার তিন থেকে চার মাসে চলনবিলে প্রায় কোটি টাকার শামুক বেচাকেনা হয়। হামকুড়িয়া, ঘরগ্রাম ও কামাড়শোন এলাকা থেকে বস্তায় ভরে ট্রাকে এসব শামুক বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। পরে তা চিংড়ি ও পাঙাশ মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
তবে শামুক আহরণের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ, প্রজাতিভিত্তিক প্রজনন ও পুনরুৎপাদনের তথ্য না থাকায় এর দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের মতে, জীবিকার সুযোগ বজায় রেখেই শামুক আহরণ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

তাড়াশ ডিগ্রি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বিদ্যুৎ কুমার বলেন, উন্মুক্ত জলাশয়ে শামুক-ঝিনুক বংশবিস্তার করে। এগুলো ক্ষুদ্র জীব ও জৈব পদার্থ খেয়ে জলজ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। মিঠাপানির মাছের খাদ্য হিসেবেও শামুক গুরুত্বপূর্ণ। নির্বিচারে শামুক নিধন চলতে থাকলে জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই শামুক আহরণ নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন, ২০১২-এর আওতায় শামুক সংরক্ষণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে শামুকের প্রজাতি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনগত এখতিয়ার যাচাই করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান বলেন, শামুক-ঝিনুক সংগ্রহের বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা হবে। প্রয়োজনে সংগ্রহকারী ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিরাজগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, শামুক-ঝিনুক জলজ পরিবেশের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নির্বিচারে এগুলো আহরণে জলজ বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং মাছের প্রজনন ও উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে শামুক-ঝিনুক সংরক্ষণে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
প্রতিনিধি/এসএস




