গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার গোপিনাথপুর ১০ শয্যার পল্লী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৪২ বছর ধরে বন্ধ আছে ইনডোর সেবা। এই হাসপাতালের ৯টি ভবনই ঝুঁকিপূর্ণ। স্থায়ী চিকিৎসক না থাকায় চারজন সিনিয়র স্টাফ নার্স ও একজন অফিস সহায়ক দিয়ে চলছে সীমিত কার্যক্রম। রোগীরা মূলত পাচ্ছেন ওষুধ। জটিল রোগের চিকিৎসা ও জরুরি প্রয়োজনে যেতে হচ্ছে দূরের হাসপাতালে। অন্যদিকে অরক্ষিত হাসপাতাল চত্বরে চুরি ও মাদকসেবীদের আড্ডার অভিযোগও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত স্থানীয়রা হাসপাতালটি সচল করার দাবি জানিয়েছেন।

১৯৬২ সালে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার গোপিনাথপুরে ৫ দশমিক ৫ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় ১০ শয্যার এই পল্লী স্বাস্থ্যকেন্দ্র। গোপিনাথপুর, নিজামকান্দি, ফুকরা, শুকতাইল, পাইককান্দি, চন্দ্র দিঘলীয়া ও জালালাবাদসহ আশপাশের এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম ভরসা ছিল হাসপাতালটি। তবে ১৯৮৪ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে ইনডোর সেবা। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় হাসপাতালের ৯টি ভবনই এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ভবনগুলোর দেয়াল থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা, ছাদে জমেছে শ্যাওলা, আর চারপাশ ঢেকে গেছে ঝোপঝাড়ে। বৃষ্টির সময় ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। হাসপাতালের কয়েকটি ভবনের অবস্থা এতটাই জরাজীর্ণ যে সেগুলো পরিত্যক্ত ভবনের মতো পড়ে রয়েছে। গোপালগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার এবং কাশিয়ানী উপজেলা থেকে প্রায় ১৯ কিলোমিটার দূরে হাসপাতালটির অবস্থান। স্থানীয়দের ভাষ্য, আশপাশে বড় কোনো চিকিৎসাকেন্দ্র না থাকায় জরুরি প্রয়োজনে চিকিৎসা নিতে গিয়ে বিপাকে পড়েন তারা। বিশেষ করে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

সিনিয়র স্টাফ নার্স নিগার সুলতানা বলেন, হাসপাতালের অধিকাংশ ভবনই জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। রোগীদের সেবা দেওয়ার ভবনটির দুটি কক্ষ দুই-তিন মাস আগে মেরামত ও রঙ করা হয়েছে। সেখানেই চলছে হাসপাতালের কার্যক্রম। হাসপাতালটি আগের মতো সচল করে ইনডোর সেবা চালু করা গেলে আশপাশের সাত-আটটি ইউনিয়নের মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে বলে মনে করেন তিনি।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও সুযোগ-সুবিধার অভাবে তাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বর্তমানে বহির্বিভাগ মূলত ওষুধ সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ কার্যক্রম। জটিল রোগের চিকিৎসা কিংবা জরুরি প্রয়োজনে অন্য হাসপাতালে যেতে হচ্ছে তাদের। এতে সময় ও অর্থ—দুই দিক থেকেই বাড়ছে চাপ।
সাবিনা খাতুন নামে এক রোগী বলেন, হাসপাতাল থেকে তারা শুধু ওষুধটুকু পান। অন্য কোনো সেবা বা সুযোগ-সুবিধা নেই।

বর্তমানে হাসপাতালে কোনো স্থায়ী চিকিৎসক নেই। চারজন সিনিয়র স্টাফ নার্স ও একজন অফিস সহায়ক দিয়ে চলছে সীমিত কার্যক্রম। দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি জনবল ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির সেবা কার্যক্রম।
স্থানীয় বাসিন্দা নিখিল বিশ্বাস বলেন, কেউ অসুস্থ হলে বা দুর্ঘটনার শিকার হলে তাকে গোপালগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিতে বেশ ভোগান্তিতে পড়তে হয়। পথে অনেক রোগীর মৃত্যু হয় বলেও দাবি করেন তিনি। এ কারণে হাসপাতালে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক নিয়োগের পাশাপাশি রাতের নিরাপত্তার জন্য একজন নাইটগার্ড রাখার দাবি জানান তিনি।

চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি হাসপাতালের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। অফিস সহায়ক মো. কোবাদ আলী বলেন, হাসপাতালে একজন চিকিৎসকের পাশাপাশি নিরাপত্তার জন্য একজন নাইটগার্ড নিয়োগ জরুরি। তার দাবি, নিয়মিত অফিসের জানালার গ্রিল ও আসবাবপত্র চুরি হচ্ছে। গতকালও হাসপাতাল ভবনের পানির লাইনের রড চুরি হয়েছে। এ ছাড়া পরিত্যক্ত নয়টি ভবনে প্রায়ই মাদকসেবীদের আড্ডা বসে।
হাসপাতালের ভবনগুলোর বিষয়ে গোপালগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. আবু সাইদ মোহাম্মদ ফারুক বলেন, ভবনগুলো এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ যে দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহারের জন্য সংস্কার করা সম্ভব নয়। স্থায়ী সমাধানের জন্য পুরোনো ভবন অপসারণ করে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ প্রয়োজন। চিকিৎসক নিয়োগের জন্য আবেদন করা হয়েছে। পাশাপাশি জরুরি কিছু সংস্কারকাজের জন্য টেন্ডার দেওয়া হয়েছে।
প্রতিনিধি/টিবি




