বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

ইউটিউব দেখে ধান চাষে নতুন স্বপ্ন, বীজ উৎপাদনের পরিকল্পনা শাহীনের

জেলা প্রতিনিধি, গাইবান্ধা
প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪১ এএম

শেয়ার করুন:

ইউটিউব দেখে ধান চাষে নতুন স্বপ্ন, বীজ উৎপাদনের পরিকল্পনা শাহীনের

মাঠজুড়ে সবুজ ধানের সমারোহ। বাতাসে দুলছে বিভিন্ন জাতের ধানের শিষ। জমিতে একাধিক জাতের ধান চাষ করে নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছেন গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের খোর্দ্দ রসুলপুর গ্রামের কৃষক তৌহিদুল ইসলাম শাহীন। প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে ইউটিউব দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে ছয় একর জমিতে আবাদ করেছেন ১১ জাতের ধান। 

তবে তার লক্ষ্য শুধু ধান উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়। এবার নিজের জমিতে উৎপাদিত ধান থেকে মানসম্মত বীজ তৈরি করতে চান তিনি। সেই বীজ দিয়ে নিজের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এলাকার অন্য কৃষকদেরও সহযোগিতা করার পরিকল্পনা তার। 

স্থানীয়রা বলছেন, কৃষিকাজে নতুন কিছু করার আগ্রহ থেকেই শাহীনের এই উদ্যোগ। সাধারণত অনেক কৃষক পরিচিত জাতের ধান চাষ করে থাকেন। কিন্তু শাহীন বিভিন্ন জাতের ধান সম্পর্কে জানতে ইউটিউবের সহায়তা নিয়েছেন। সেখান থেকে পাওয়া ধারণা তাকে নতুন জাতের ধান চাষে আগ্রহী করে তোলে। সেই আগ্রহ থেকেই চলতি আমন মৌসুমে ছয় একর জমিতে ১১ জাতের ধান আবাদ করেছেন তিনি। 

শাহীনের চাষ করা ধানের জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে কাঁঠালী, হাইব্রিড চিনিগুঁড়া, যমুনা ও লং বাসমতিসহ আরও কয়েকটি জাত। একই মৌসুমে বিভিন্ন জাতের ধান চাষের মাধ্যমে সেগুলোর বৈশিষ্ট্য, ফলন ও সম্ভাবনা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চান তিনি। তার আশা, এ অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে বীজ উৎপাদনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজে আসবে। 

কথা বলে জানা গেছে, কৃষক শাহীনের পরিকল্পনার মূল জায়গায় রয়েছে মানসম্মত বীজ উৎপাদন। নিজের জমিতে চাষ করা বিভিন্ন জাতের ধানের মধ্যে উপযুক্ত জাত নির্বাচন করে বীজ উৎপাদনের উদ্যোগ নেবেন। এতে একদিকে নিজের পরবর্তী মৌসুমের চাষাবাদের জন্য বীজ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে এলাকার কৃষকদের কাছেও মানসম্মত বীজ পৌঁছে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, কৃষিতে বীজের গুরুত্ব অপরিসীম। ভালো ফলনের জন্য জমির উপযোগিতা, সঠিক পরিচর্যা, সার ব্যবস্থাপনা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মানসম্মত বীজের প্রয়োজন হয়। বীজের মান ভালো না হলে কৃষকের শ্রম, সময় ও বিনিয়োগের প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে। এ কারণে নিজ উদ্যোগে বীজ উৎপাদনের পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন শাহীন। 

S

তবে ধান উৎপাদন এবং মানসম্মত বীজ উৎপাদনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বীজ হিসেবে ব্যবহারের জন্য জাতের বিশুদ্ধতা, বীজের অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা, রোগমুক্ত অবস্থা এবং সঠিকভাবে শুকিয়ে সংরক্ষণের বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হয়। বিশেষ করে একসঙ্গে একাধিক জাতের ধান চাষ করলে জাতের পরিচয় ও বিশুদ্ধতা বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শাহীনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। 

জানা গেছে, বর্তমান সময়ে কৃষি বিষয়ে তথ্য জানার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে ইন্টারনেট ও ইউটিউব। বিভিন্ন জাতের ফসল চাষ, জমি প্রস্তুত, সার প্রয়োগ, রোগবালাই দমন এবং আধুনিক কৃষিপদ্ধতি সম্পর্কে ভিডিও দেখে ধারণা নিতে পারেন কৃষকেরা। শাহীনও সেই মাধ্যম থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে নতুন জাতের ধান চাষের উদ্যোগ নিয়েছেন। 

তবে ভিডিও দেখে কোনো পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার পর স্থানীয় মাটি, আবহাওয়া ও চাষের পরিবেশ অনুযায়ী তা প্রয়োগ করা জরুরি। কারণ এক এলাকার কৃষিপদ্ধতি অন্য এলাকায় একইভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। এ ক্ষেত্রে কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো গুরুত্বপূর্ণ। 

শাহীনের উদ্যোগে প্রযুক্তিনির্ভর তথ্যের সঙ্গে মাঠের বাস্তব অভিজ্ঞতা যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তার পরিকল্পনা সফল হলে ভবিষ্যতে বীজ উৎপাদন নিয়ে আরও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এদিকে শাহীনের উদ্যোগকে ঘিরে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও সম্ভাবনার বিষয়টি সামনে এসেছে। স্থানীয় পর্যায়ে মানসম্মত বীজ উৎপাদন করা সম্ভব হলে কৃষকদের বীজ সংগ্রহের সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে উপযুক্ত জাত নির্বাচন ও সঠিক চাষপদ্ধতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগও তৈরি হতে পারে। তাই জাত নির্বাচন, বীজের বিশুদ্ধতা যাচাই ও সংরক্ষণের বিষয়ে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। 

স্থানীয় কৃষক মামুন মন্ডল বলেন, শাহীনের উদ্যোগ সফল হলে তা অন্য কৃষকদেরও নতুনভাবে ভাবতে উৎসাহিত করতে পারে। কৃষিকাজে শুধু প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করে নতুন জাত সম্পর্কে জানা, পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করা এবং অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে উদ্যোগটির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে ধানের ফলন, বীজের গুণগত মান এবং কৃষিতাত্ত্বিক উপযোগিতার ওপর। 

ছয় একর জমিতে ১১ জাতের ধান চাষের মধ্য দিয়ে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের পথে রয়েছেন শাহীন। ইউটিউব দেখে শুরু হওয়া তার আগ্রহ এখন বীজ উৎপাদনের পরিকল্পনায় রূপ নিয়েছে। তার লক্ষ্য, ধান চাষের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে মানসম্মত বীজ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া। 

উদ্যোক্তা তৌহিদুল ইসলাম শাহীন জানান, তার এই প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে বাস্তব সম্ভাবনায় রূপ নেবে। নিজের চাষাবাদের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এলাকার অন্য কৃষকদের জন্যও মানসম্মত বীজ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করতে পারবেন তিনি। সেই লক্ষ্য পূরণ হলে কৃষিকাজে নিজের লাভের পাশাপাশি স্থানীয় কৃষিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি হবে। 

সাদুল্লাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ অপূর্ব ভট্টাচার্য বলেন, কৃষি উৎপাদনে বীজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত মানসম্মত বীজ ব্যবহার করেও ধান চাষ করা হচ্ছে। তৌহিদুল ইসলাম শাহীনের এই উদ্যোগ ভালো। তবে বীজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে গুণগত মান ও জাতের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা জরুরি।

এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর