বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

স্বামীহীন মমতার মাথায় শাকের বোঝায় গড়ছে তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ

সুমন চন্দ্র, দিনাজপুর
প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩৮ পিএম

শেয়ার করুন:

স্বামীহীন মমতার মাথায় শাকের বোঝায় গড়ছে তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ
মাথায় শাকের বোঝা নিয়ে ফেরি করছেন সংগ্রামী মা মমতা। ছবি: ঢাকা মেইল

‘শাক লাগবে শাক, বারো মিশালি শাক’ সকাল হলেই এমন হাঁকডাকে মুখর হয়ে ওঠে দিনাজপুরের হিলি পৌর এলাকার পাড়া-মহল্লা। মাথায় শাক-সবজির বোঝা নিয়ে এক গলি থেকে অন্য গলিতে ছুটে চলেন ৩০ বছর বয়সী মমতা বেগম। রোদ-বৃষ্টি কিংবা শরীরের ক্লান্তি কোনো কিছুই থামাতে পারে না তার পথচলা। কারণ, এই পথচলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তিন সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়া, তাদের পড়াশোনার খরচ জোগানো আর একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন।

সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ মমতা। দীর্ঘদিন ধরে স্বামী নিখোঁজ। স্ত্রী-সন্তানদের কোনো খোঁজ-খবর নেন না, দেন না সংসার চালানোর খরচও। তাই অভাবের সংসারে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছেন তিনি। মাথায় শাকের বোঝা আর বুকে সন্তানদের মানুষ করার অদম্য প্রত্যয় নিয়ে প্রতিদিন শুরু হয় তার জীবনসংগ্রাম।

মমতা বেগমের বাড়ি জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার হাটখোলা গ্রামে। দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জননী তিনি। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে। দুই ছেলে মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। ছোট মেয়েটি থাকে মায়ের সঙ্গে। নানির দেওয়া সামান্য জায়গায় ছোট্ট একটি কুঁড়েঘরে সন্তানদের নিয়ে তার বসবাস। সেই ঘরেই অভাবের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে চলে তাদের জীবন।

প্রতিদিন ভোর হলেই জীবিকার সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন মমতা। গ্রামের মাঠ-ঘাট ও বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করেন বারো মিশালি শাক, কলার থোর, মোচাসহ নানা ধরনের শাক-সবজি। সেগুলো বস্তায় ভরে মাথায় তুলে রওনা দেন হিলির উদ্দেশে। বাড়ি থেকে হিলি শহরের দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। দীর্ঘ পথ হেঁটে শাক-সবজি নিয়ে শহরে পৌঁছানোর পর শুরু হয় আরেক দফা পরিশ্রম।

সকাল থেকে দুপুর, কখনো বিকেল পর্যন্ত পাড়া-মহল্লায় ঘুরে ঘুরে শাক-সবজি বিক্রি করেন তিনি। ক্রেতার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে হাঁক দেন, ‘শাক লাগবে শাক, বারো মিশালি শাক।’ কেউ কেনেন, কেউ আবার না কিনেই চলে যান। এভাবেই সামান্য আয় দিয়ে চলে তার সংসার।

মাথায় ভারী বোঝা নিয়ে দীর্ঘ পথ হাঁটার পর আবার অলিগলি ঘুরে শাক বিক্রি করা সহজ কাজ নয়। সারাদিনের পরিশ্রমে শরীর ক্লান্ত হয়ে আসে। তবুও বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ খুব একটা মেলে না। কারণ, একদিন কাজ না করলে সেদিনের সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে। সন্তানদের খাবার ও পড়াশোনার খরচের কথা ভেবে ক্লান্ত শরীর নিয়েও তাকে ছুটতে হয়।

মমতার জীবনে অভাব আছে, আছে অনিশ্চয়তা। নেই স্বামীর সহযোগিতা কিংবা সংসারের বোঝা ভাগ করে নেওয়ার মতো কেউ। কিন্তু সন্তানদের নিয়ে তার স্বপ্নের কমতি নেই। নিজের কষ্টকে তেমন গুরুত্ব দেন না তিনি। সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে পারা, তাদের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে পারাই তার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

হিলির ভীমপুর গ্রামের গৃহিণী নাহিদা আক্তার বলেন, এই আপা অনেক ভালো মানুষ। প্রতিদিন সকাল হলেই তাকে শাক বিক্রি করতে দেখি। মাথায় করে এত দূর থেকে হেঁটে আসেন। তাকে দেখলে খুব কষ্ট হয়। সন্তানের জন্য একজন মা কতটা পরিশ্রম করতে পারেন, তাকে দেখলেই বোঝা যায়। আমি আমার পক্ষ থেকে যতটা সম্ভব তাকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করি।

মহিলা কলেজপাড়ার বাসিন্দা মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, বিচিত্র এই দুনিয়ায় মানুষ জীবিকার তাগিদে নানা পেশা বেছে নেয়। এই নারী আসলেই একজন সংগ্রামী মা। সন্তানদের মানুষ করতে তিনি কঠোর পরিশ্রম করছেন। আমার দেখা এমন সংগ্রামী মায়ের সংখ্যা খুবই কম। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষদের উচিত তার মতো অসহায় মায়েদের পাশে দাঁড়ানো।

নিজের জীবনের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে মমতা বেগম বলেন, অনেকে অনেক কথা বলে, আমি কিছুই মনে করি না। ছেলেমেয়ে জন্ম দিয়েছি, তাদের মানুষ করতে হবে। স্বামী আমাকে ছেড়ে গেছে। কিন্তু আমি তো মা, সন্তানদের গর্ভে ধারণ করেছি। তাই তাদের ফেলে রাখতে পারি না। প্রতিদিন অনেক কষ্ট করে শাক বিক্রি করি। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করলেও সন্তানদের মুখে হাসি দেখলে সব কষ্ট দূর হয়ে যায়।

প্রতিনিধি/এলএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর