ফরিদপুরের নগরকান্দায় সুদে নেওয়া টাকা আদায়কে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে একটি পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় একই পরিবারের পাঁচজনসহ অন্তত সাতজন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ছয়জনকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অপর পক্ষের চারজন আহত হয়ে নগরকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন বলে দাবি করা হয়েছে।
রোববার (১১ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে নগরকান্দা উপজেলার কাইচাইল ইউনিয়নের মধ্যকাইচাইল গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় পাঁচটি বসতঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও উঠেছে। হামলায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নগরকান্দা থানা যুবলীগের সভাপতি ও পাঁচকাইচাইল গ্রামের বাসিন্দা হানিফ রানার (৪৮) বিরুদ্ধে। আহত ব্যক্তিরা স্থানীয় ইউপি সদস্য ফজলুল হকের পরিবারের সদস্য।
আহত ব্যক্তিরা হলেন ফজলুল হকের ছোট দুই ভাই ইয়ার আলী (৪০) ও সুজন মিয়া (৩৫), বোন শিউলী বেগম (৩০), সুজনের স্ত্রী রত্না বেগম (২৫) এবং ইয়ার আলীর ছেলে ইয়ামিন (১৭)। এ ছাড়া স্থানীয় বাজারের চায়ের দোকানি মনু মিয়া (৫৫) মারধরে আহত হয়েছেন। তার একটি হাত ভেঙে গেছে। তিনি ট্রমা সেন্টারে চিকিৎসাধীন।
রোববার সন্ধ্যায় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, আহত ছয়জন হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি অ্যান্ড নিউরোলজি বিভাগের পুরুষ ও নারী ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে ইয়ার আলীর শরীরে ধারালো অস্ত্রের ছয়টি কোপের চিহ্ন রয়েছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হানিফ রানার সমর্থক আয়ুব আলী মিয়া (৬০) ও ফজলুল হকের সমর্থক আলমগীর মিয়ার মধ্যে তাস খেলা এবং সুদের টাকা পাওনা নিয়ে বিরোধ চলছিল। এর জেরে রোববার সকালে আয়ুবের নেতৃত্বে আলমগীরকে ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সময় ফজলুল হকের দুই ভাই ইয়ার আলী ও সুজন বাধা দিলে বাগ্বিতণ্ডা ও হাতাহাতি হয়। পরে হানিফ রানার নেতৃত্বে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি দল দেশীয় অস্ত্র রামদা, ঢাল ও সরকি নিয়ে তাদের পরিবারের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এতে পরিবারের ছয় সদস্য আহত হন। পাঁচটি বসতঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
আহত সুজন মিয়া অভিযোগ করে বলেন, ‘আয়ুব আলী মিয়া এলাকায় তাস খেলোয়াড়দের সুদের ওপর টাকা দেন। এভাবে অনেক পরিবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আলমগীরকেও টাকা দিয়ে ফাঁদে ফেলা হয়েছে। প্রতিদিন এক হাজার টাকা করে দিতে দিতে সে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। একপর্যায়ে পুরো টাকা দিতে না পারায় সকালে আলমগীরকে গামছা দিয়ে বেঁধে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। তখন আমরা পাশের মনু মিয়ার চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম। আলমগীরকে ধরে নিয়ে যেতে দেখে আমরা বাধা দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে রাখি। তখনই আমাদের মারধর করা হয়। চায়ের দোকানির হাতও ভেঙে দেওয়া হয়।’
সুজন আরও বলেন, ‘পরে আমরা বাড়িতে চলে যাই। প্রায় আধা ঘণ্টা পর রামদা নিয়ে আমাদের বাড়িতে এসে অতর্কিত হামলা চালানো হয়। প্রথমে আমার ভাইকে কোপানো হয়। তাকে বাঁচাতে গেলে আমাকেও কোপানো হয়।’
এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন ইউপি সদস্য ফজলুল হক। তিনি অভিযোগ করেন, হানিফ রানা সন্ত্রাসী প্রকৃতির লোক এবং তার বিরুদ্ধে অন্তত ১২টি মামলা রয়েছে। হানিফ রানাসহ হামলায় জড়িত সবাইকে দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানান তিনি।
অন্যদিকে হানিফ রানা বলেন, অপর পক্ষের আয়ুব আলী মিয়াসহ চারজন নগরকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রয়েছেন। ঘটনার সময় তিনি সেখানে ছিলেন না বলেও দাবি করেন তিনি। হানিফ রানা বলেন, আগে তিনি দল পরিচালনা করলেও বর্তমানে ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মুন্নু মিয়া দল পরিচালনা করেন। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন বলে তাকে এ ঘটনায় জড়ানো হয়েছে।
হানিফ রানা আরও দাবি করেন, তাস বা জুয়ার টাকা নিয়ে কোনো বিরোধ হয়নি। আয়ুব আলী ভারতে থাকতেন এবং সেখান থেকে আলমগীরের কাছে ৮৫ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন। সেই টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটেছে।
নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানি আজাদ বলেন, টাকা পাওনাকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটেছে। তবে কীসের টাকা, তা তিনি জানেন না। এ ঘটনায় রোববার রাতে হানিফ নামের এক ব্যক্তি বাদী হয়ে ১৫ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন। পুলিশ একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠিয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা আফরিন বলেন, থানার মাধ্যমে দুই পক্ষের মারামারির বিষয়টি তিনি জেনেছেন। তবে জুয়া খেলার জন্য সুদে টাকা নেওয়া-দেওয়াকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটেছে কি না, তা তার জানা নেই। বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ধরনের অপরাধে কেউ জড়িত থাকলে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানান তিনি।
প্রতিনিধি/এসএস




