আগুনে পুড়ে গেছে সাহিদা বেগমের ছোট্ট সংসারের সবকিছু। স্বামী-সন্তান নিয়ে যে ঘরে এতদিন সংসার চলেছে, এখন সেখানে শুধু পোড়া টিন, ছাই আর ধ্বংসস্তূপ। খাট, টেলিভিশন, ফ্রিজ, হাঁড়ি-পাতিল কিছুই রক্ষা করতে পারেননি তিনি। জীবন বাঁচাতে কোনো রকমে ঘর থেকে বের হতে পারলেও সঙ্গে নিতে পারেননি সংসারের কোনো জিনিসপত্র।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাতে ঢাকার সাভারের আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় ঝুটের গোডাউনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই পোড়া ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের হারিয়ে যাওয়া সংসারের সামান্য কিছু খুঁজছিলেন সাহিদা। কখনো পোড়া কাপড় সরাচ্ছেন, কখনো ছাইয়ের মধ্যে হাতড়ে দেখছেন কিছু অবশিষ্ট আছে কি না।
সাহিদা বলেন, আগুন লাগার পর কিছু বুঝে ওঠার আগেই চারপাশে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। কোনো রকমে স্বামী-সন্তানকে নিয়ে ঘর থেকে বের হতে পেরেছেন। কিন্তু ঘরের কিছুই বের করতে পারেননি। এখন নতুন করে সংসার শুরু করবেন কীভাবে, সেটিই তার সবচেয়ে বড় চিন্তা।

সাহিদার পাশের ঘরের বাসিন্দা পলাশের অবস্থাও একই। চাকরি করে ধীরে ধীরে গড়ে তোলা সংসারের সামান্য সম্বলটুকুও পুড়ে গেছে আগুনে। পোড়া ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে তিনিও এখন ভাবছেন, কীভাবে আবার ঘুরে দাঁড়াবেন।
শুধু সাহিদা বা পলাশ নন, ওই আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আশপাশের আরও কয়েকটি বসতঘর। একই সঙ্গে পুড়ে গেছে একাধিক ঝুটের গোডাউনে থাকা বিপুল পরিমাণ মালামাল। গোডাউন মালিকদের দাবি, আগুনে ১৯টি গোডাউনের প্রায় চার কোটি টাকার মালামাল পুড়ে গেছে। এতে অনেক ব্যবসায়ী বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন; কারও কারও পথে বসার মতো অবস্থা হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত গোডাউনগুলোর মালিক আলমগীর বলেন, তার তিনটি গোডাউনসহ মোট ১৯টি গোডাউনে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এসব গোডাউনে থাকা ঝুট ও অন্যান্য মালামাল মিলিয়ে আনুমানিক চার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। বহুদিনের ব্যবসার পুঁজি হারিয়ে অনেক ব্যবসায়ী এখন চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একটি শব্দ হওয়ার পর আগুনের সূত্রপাত হয়। পরে ঝুট ও কাপড়ের স্তূপে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় তা আশপাশের বসতঘরেও ছড়িয়ে পড়ে। সরু সড়ক ও সড়কের বিভিন্ন অংশ দখল হয়ে থাকায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতেও সময় লেগেছে বলে অভিযোগ তাদের।
ফায়ার সার্ভিসের পাঁচটি ইউনিট দীর্ঘ সময় চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পরও ঝুট ও কাপড়ের স্তূপ থেকে দীর্ঘ সময় ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে পোড়া টিন, কাপড় ও বিভিন্ন ধরনের মালামাল।
স্থানীয়দের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, আগুনের সময় ও পরে কিছু মালামাল লুট হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো থানায় কোনো অভিযোগ করা হয়নি বলে জানিয়েছেন তারা। ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলা হয়নি।

ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক হাফিজুর রহমান বলেন, গত শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে আগুন লাগার পর তা নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের বেশ বেগ পেতে হয়। ঘটনাস্থলে পানির সংকট ছিল। পাশাপাশি সড়কে যানজট থাকায় ঘটনাস্থলে পৌঁছাতেও কিছুটা সময় লাগে। এর মধ্যে আগুন বেশ কিছুটা ছড়িয়ে পড়ে। তবে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। এ ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ইউনিটির সভাপতি ফরিদুল ইসলাম বলেন, আশুলিয়া একটি শিল্প অধ্যুষিত এলাকা। এখানে লাখো শ্রমিকের বসবাস। অথচ আবাসিক এলাকার পাশে এ ধরনের ঝুটের গোডাউন থাকায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। জামগড়ার আগুনে বহু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই প্রশাসনের উচিত দ্রুত আবাসিক এলাকার ভেতর বা আশপাশে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ ঝুটের গোডাউনগুলো চিহ্নিত করে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া।
প্রতিনিধি/টিবি




