যশোরে আমন ধান আবাদ করে উৎপাদন খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়েছে কৃষকদের জন্য। ডিজেলের দাম বৃদ্ধি, সারের বাড়তি মূল্য, কৃষিশ্রমিকের মজুরি এবং কীটনাশকের ব্যয়—সব মিলিয়ে একদিকে যেমন বেড়েছে ধান উৎপাদনের খরচ, অন্যদিকে বাজারে ধানের দাম রয়েছে তুলনামূলক কম। ফলে ভালো ফলনের আশা থাকলেও আবাদ শেষে লাভ তো দূরের কথা, মূলধন ফেরত পাওয়া নিয়েই শঙ্কায় রয়েছেন কৃষকরা।
জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের তুলনায় এবার আমন আবাদে বিঘাপ্রতি অন্তত ২ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। আবার কিছু জমিতে সেচের প্রয়োজন হলে খরচ আরও বাড়ছে। অথচ বর্তমানে ধানের বাজারদর মণপ্রতি ৯৫০ থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫০ টাকা পর্যন্ত।
কৃষকদের হিসাবে, ১৬ মণ ধান উৎপাদন হলেও বর্তমান দরে বিক্রি করে পাওয়া যাচ্ছে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ৮০০ টাকা। বিপরীতে অনেক জমিতে উৎপাদন ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ১৮ থেকে ২১ হাজার টাকা পর্যন্ত।
কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে ধান বিক্রির দাম বাড়ছে না, কিন্তু চাষের প্রায় প্রতিটি উপকরণের দাম বেড়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে কৃষকদের হিসাবে, গত বছর জমি প্রস্তুতে প্রতি চাষে যেখানে প্রায় ৩০০ টাকা খরচ হয়েছে, এবার সেখানে দিতে হচ্ছে প্রায় ৩৫০ টাকা। আমন আবাদে সাধারণত চার দফা চাষ দিতে হয়। ফলে শুধু জমি তৈরিতেই বিঘাপ্রতি প্রায় ২০০ টাকা বাড়তি যাচ্ছে।
একইভাবে শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৪০০ টাকা থেকে বেড়ে ৫০০ টাকা হওয়ায় চারা রোপণ ও নিড়ানিতে বিঘাপ্রতি খরচ বেড়েছে প্রায় ১ হাজার টাকা। এর সঙ্গে সার ও কীটনাশকের বাড়তি দামের চাপও যুক্ত হয়েছে।
যশোর সদর উপজেলার চুড়মনকাটি ইউনিয়নের আবদুলপুর গ্রামের আমিন উদ্দিন বলেন, তিন বিঘা জমিতে এবার আমন আবাদ করেছি। কিন্তু বীজতলা ও জমি তৈরি থেকে শুরু করে ঘরে ধান উঠা পর্যন্ত যে পরিমাণ খরচ হবে; তাতে লোকসান হবে।
তিনি আরও বলেন, ধানের দাম যদি না বাড়ে, তাহলে এবার চাষ করে লাভের বদলে ক্ষতি বেশি।
সদর উপজেলার জলকর গ্রামের কৃষক অলিয়ার রহমান বলেন, সরকারি দরে সার পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে বেশি দামে কিনতে হয়েছে। দুই বিঘা ছয় কাঠা জমিতে আমন আবাদ করা এই কৃষক এক বস্তা টিএসপি ২ হাজার ২০০ টাকা, এক বস্তা এমওপি ১ হাজার ২০০ টাকা এবং দুই বস্তা ইউরিয়া ১ হাজার ৪০০ টাকা করে কিনেছেন। তার নিজের জমি মাত্র আট কাঠা; বাকি জমি বন্ধক (বর্গা) নেওয়া। তাই বাড়তি খরচের চাপ তার জন্য আরও বেশি।
ভায়না গ্রামের কৃষক তোফাজ্জেল মোল্যার বলেন, সরকার যে দামে সার বিক্রির কথা বলছে, সেই দামে সব সময় সার পাওয়া যাচ্ছে না। বেশি দামে সার কিনে ধান আবাদ করে শেষ পর্যন্ত হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে যশোরে ১ লাখ ৩৩ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে।
কৃষি বিভাগের হিসাবে, ৩৩ শতকে এক বিঘা ধরে এক বিঘা জমিতে আমন চাষে গড়ে ৩০ কেজি ইউরিয়া, ১৫ থেকে ২০ কেজি টিএসপি এবং ১৫ থেকে ২০ কেজি এমওপি প্রয়োজন হয়। টিএসপির পরিবর্তে সমপরিমাণ ডিএপিও ব্যবহার করা যায়।
সরকার নির্ধারিত দরে ৫০ কেজির এক বস্তা টিএসপি ও ডিএপির দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা এবং এমওপির দাম ১ হাজার টাকা। ইউরিয়ার ৫০ কেজির বস্তার দামও ১ হাজার ৩৫০ টাকা নির্ধারিত। তবে কৃষকদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে তারা নির্ধারিত দামে এসব সার কিনতে পারছেন না।
কৃষি-সংশ্লিষ্টদের হিসাব বলছে, গত বছর ৩৩ শতকের এক বিঘা জমিতে আমন আবাদে মোট খরচ ছিল প্রায় ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা। এবার সেই ব্যয় বেড়ে ১৮ থেকে ২১ হাজার টাকায় পৌঁছাতে পারে। বিপরীতে গড়ে ১৫ থেকে ১৬ মণ ধান উৎপাদন হলে বর্তমান বাজারদরে সেই ধানের মোট মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৪ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ১৬ হাজার ৮০০ টাকা। অর্থাৎ ফলন ভালো হলেও বর্তমান বাজারদরে অনেক কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ই উঠে আসছে না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর যশোরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. জাহিদুল ইসলাম বিশ্বাস বলেন, আমন ধানে সার প্রয়োগের সময় প্রায় শেষ। উঁচু জমিতে কোথাও কোথাও সম্পূরক সেচের প্রয়োজন হতে পারে। ডিজেলের দাম বেশি হওয়ায় সেখানে কৃষকের খরচ আরও বাড়বে।
তার মতে, উৎপাদন ব্যয়ের বাড়তি চাপ সামলানোর একটি উপায় হতে পারে ধানের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা। ধানের দাম না বাড়লে কৃষকের ওপর চাপ থেকেই যাবে।
প্রতিনিধি/এমএইচআর




