শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

হাতহীন শিক্ষক আলতাফের পায়ে লিখে শিক্ষকতার গল্প

বাকি বিল্লাহ, নরসিংদী
প্রকাশিত: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৯ পিএম

শেয়ার করুন:

হাতহীন শিক্ষক আলতাফের পায়ে লিখে শিক্ষকতার গল্প
ছবি: ঢাকা মেইল

শরীরের সামান্য অক্ষমতাকে পুঁজি করে অন্যের নিকট হাত পাতা বা ভিক্ষা চাওয়া আমাদের সমাজের একটা চিত্র হয়ে গেছে। কিন্তু শারীরিক অক্ষমতা থাকলেও যে মানুষের কাছে হাত না পেতে যুদ্ধ করে জীবন চালানো যায় তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন আলতাফ হোসেন। 

জন্ম থেকে দুইটা হাত না থাকলেও পা দিয়ে লিখে শিক্ষকতা করে ডিগ্রী পাশ করেছেন আলতাফ হোসেন। শিক্ষা জীবন শেষে চাকুরির জন্য লিখিত পরীক্ষা পাশ করলেও ভাইভা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠিত স্কুলে পায়ে লিখে শিক্ষকতা করে চালাচ্ছেন জীবন। 

জানা যায়, নরসিংদী সদর উপজেলার নগর পাঁচদোনা এলাকায় ১৯৬২ সালে আলতাফ হোসেনের জন্ম। তার বাবার নাম তমিজ উদ্দিন। 

তমিজ উদ্দিনের সংসারে পরপর তিন ছেলে জন্ম নিয়ে মারা যাওয়ার পরে শিশু আলতাফ হোসেনের জন্ম। জন্ম থেকেই তার দুই হাত না থাকার কারণে এক প্রকার আক্ষেপেই তার দাদা নাম রাখেন দুঃখু মিয়া। দাদার আক্ষেপের নাম যেমন দু:খু মিয়া তেমনি তার জীবনের সাথেও দুঃখ কষ্ট মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। জীবনের বাঁকে বাঁকে শুরু হয় জীবন যুদ্ধ।

আলতাফ হোসেনের লেখাপড়া শুরু হয় স্থানীয় পাঁচদোনা ইউনিয়নের দিঘিরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। দুই হাত না থাকায় শুধু পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তার বাবার সঙ্গে সহযোগিতায় পা দিয়ে লেখার অভ্যাস গড়ে তোলেন।

রান্না করার পাতিলের কালি এবং তার সাথে পানি মিশিয়ে বাঁশের কঞ্চি পায়ের দুই আঙ্গুলের মাঝে রেখে কলা গাছের পাতার উপর লিখে শুরু হয় বর্ণমালা লেখা। এভাবে ধীরে ধীরে লিখে হয় অভ্যাস। এরপর আর থেমে থাকা নয়। শ্রেণির পর শ্রেণি উত্তীর্ণ হতে থাকে। এভাবেই জীবনের সাথে যুদ্ধ করে স্থানীয় স্কুল -কলেজ থেকে ১৯৮২ সালে মাধ্যমিক এবং ১৯৮৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। এর পরে ১৯৮৬ সালে নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেন আলতাফ হোসেন ওরফে দুঃখু মিয়া। 

শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পর শুরু হয় কর্মসংস্থানের সংগ্রাম। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য আবেদন করে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও ভাইভায় গিয়ে বারবার বাদ পড়েছেন। চাকরির আশায় বিভিন্ন মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তার দ্বারেও ঘুরেছেন। কিন্তু কোথাও চাকুরি জোটেনি।

চাকরি না পেলেও জীবনে বাড়তে থাকে হতাশা। এক সময় চাকরির চিন্তা বাদ দিয়ে, মন থেকে হতাশা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে টিউশনি ও কোচিং শুরু করেন। সেখান থেকে কিছু টাকা সঞ্চয় করে এবং বাবার দেওয়া জমিও বিক্রি করে সেই অর্থ দিয়ে ২০০৭ সালে নিজের পৈতৃক জমিতে প্রতিষ্ঠা করেন প্রতিভা দুঃখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন।

আলতাফ হোসেনের প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ১৪৫ শিক্ষার্থী আছে। তাদেরকে পাঠদানের জন্য আছে ১০ শিক্ষক। আনুষঙ্গিক কাজের জন্য রয়েছেন আরও দুজন কর্মচারী। বিদ্যালয়টিতে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য আছে বিনামূল্যে পড়াশোনার সুযোগ।

সরেজমিন বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, টিনশেড ভবনের একটি শ্রেণিকক্ষে পা দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখছেন দুঃখু মিয়া। হাসি মুখে গল্পের ছলে শিক্ষার্থীদের পাঠ বুঝিয়ে দিচ্ছেন তিনি। দুই হাত না থাকার বোর্ডে পা দিয়ে লিখে পাঠদান করে যাচ্ছেন অবলিলায়। 

আলিতাফ জানান, বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর থেকে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সম্মানীও অনেক সময় প্রত্যাশিত মাত্রায় দিতে পারেন না। তবে তার প্রতি সহানুভূতিশীল শিক্ষকরা প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। 

ভবিষ্যতে বিদ্যালয়টিকে একটি মডেল উচ্চবিদ্যালয়ে রূপ দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন দুঃখু মিয়া। তার আরও ইচ্ছা, প্রতিষ্ঠানটি একদিন বড় পরিসরে গড়ে উঠবে এবং এর দায়িত্ব নেবেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাই।

তিনি আরো জানান, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয় পরিচালনা করলেও সরকারি তেমন কোনো সহযোগিতা পায়নি।  এ বিষয়ে তিনি বলেন, এত কাজের পরেও আজ পর্যন্ত সরকারের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাইনি। এমনকি আমার স্কুলের জন্যও সরকারের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাইনি।

আলতাফ হেসেনের স্কুলে শিক্ষকতা করেন তার ছেলে মোহাইমিনুল ইসলাম। এ সকল বিষয় নিয়ে তিনি বলেন, শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে বাবা সমাজে শিক্ষার প্রসারে কাজ করছেন। এর থেকে আনন্দের আর কী হতে পারে।

বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী কাওছার বলে, আমাদের স্যার পা দিয়ে লেখেন। কিন্তু অনেকের হাতের লেখা থেকেও সুন্দর। স্যার খুব যত্ন করে পড়ান।

সহকারী শিক্ষক আসমা বেগম বলেন, স্যারের জীবন আমাদের বিরুদ্ধস্রোতে এগিয়ে চলা আমাদেরকে সাহস জোগায়।

স্থানীয় বাসিন্দা করিম বলেন, দুঃখু মিয়ার জীবন কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দুই হাত না থাকলেও তিনি সমাজে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তার এই অবদানের জন্য সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল।

আলতাফ হোসেন জানান, তার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের স্মৃতিগুলোর একটি শৈশবের। ছোটবেলায় বাবা তাকে স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় ভর্তি করাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু দুই হাত না থাকায় পা দিয়ে ধর্মীয় গ্রন্থ পড়তে হবে এই কারণ দেখিয়ে তাকে ভর্তি করা হয়নি।

সেই বঞ্চনার স্মৃতিই পরবর্তী সময়ে তার স্বপ্নের পথ দেখায়। যে সমাজ তাকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ দিতে চায়নি, সেই সমাজের শিশুদের জন্যই এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।

আলতাফ হোসেন আরো বলেন, আমি এলাকার শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো বিলিয়ে যেতে চাই। কোনো প্রতিবন্ধী শিশু যেন শিক্ষা নিতে এসে আমার মতো হেয় প্রতিপন্ন না হয়। এমন ইচ্ছা থেকেই এই উদ্যোগ।

সামান্য অজুহাতে অন্যের নিকট হাত পেতে ভিক্ষা করা যে সমাজের একটা চিত্রাংশ। সে সমাজের জন্য আলতাফ হোসেন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কোনও সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিকূলতা যে জীবন আটকাতে পারে না সেটাই দেখিয়ে গেছেন দুই হাত বিহীন পা দিয়ে লিখে পাঠ দান করা শিক্ষক আলতাফ হোসেন।

প্রতিনিধি/এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর