সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

হাতের কব্জি হারিয়েও দুই যুগ ধরে ছড়াচ্ছেন শিক্ষার আলো

মো. রাশেদ আলী, নীলফামারী 
প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩৪ পিএম

শেয়ার করুন:

হাতের কব্জি হারিয়েও দুই যুগ ধরে ছড়াচ্ছেন শিক্ষার আলো
বোর্ডে লিখে ছাত্রছাত্রীদের পাঠদান করছেন শিক্ষক আব্দুল হাকিম

যে হাতে কলম ধরার কথা ছিল না, সেই হাতই আজ শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে শত শত শিক্ষার্থীর মাঝে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষকতা করছেন নীলফামারীর আব্দুল হাকিম। অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর আত্মবিশ্বাসে তিনি হয়ে উঠেছেন অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল নাম। 

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মাত্র সাত বছর বয়সে খেলতে গিয়ে মাঠে পাওয়া একটি বোমা হাতে নেন আব্দুল হাকিম। বিস্ফোরণে হারান দুই হাতের কব্জি ও একটি চোখ। কিন্তু থেমে যাননি তিনি। সব বাধা পেরিয়ে স্বাভাবিক জীবন গড়ে তোলার পাশাপাশি গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ছড়িয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার আলো। তার জীবন যেন এক বার্তা, অক্ষমতা নয়, মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ইচ্ছাশক্তি। 

নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সদর ইউনিয়নের বড় রাউতা গ্রামে আব্দুল হাকিমের বসবাস। মাত্র ৭ বছর বয়সে দু’হাত ও এক চোখ হারালেও লেখাপড়া চালিয়ে যান তিনি। এইচএসসি পাস করে গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। সেই থেকে দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে দক্ষিণ বড় রাউতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারি শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন তিনি।  

সাইকেল চালাচ্ছেন, লিখছেন, বাচ্চাদের পড়াচ্ছেন, করছেন পরিবারের নানা টুকিটাকি কাজ, অবসরে সময় দিচ্ছেন ছেলের ফার্মেসিতে। দেখে মনেই হবে না তার কোনো শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আছে। নিজের পাশাপাশি সন্তানদেরও পড়িয়েছেন। 

শিক্ষক আব্দুল হাকিম জানান, ছোটবেলায় একটি কুড়িয়ে পাওয়া বোমা দিয়ে খেলতে গিয়ে সেটা বিস্ফোরণে দুই হাত এবং একটি চোখের সমস্যা হয়। আমার অবস্থা দেখে অনেকেই ভেবেছিলেন রাস্তায় ভিক্ষা করে আমাকে চলতে হবে। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর বাড়ির পাশেই এই স্কুলে যোগদান করি এবং তখন থেকে এই স্কুলেই চাকরি করছি। নিজের চেষ্টা এবং আল্লাহর প্রতি ভরসা আমাকে আজ এই স্থানে পৌঁছে দিয়েছে। যারা হতাশায় ভুগছে তারাও যদি আল্লাহর উপর ভরসা রেখে মন প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করেন, তাহলে তারাও একদিন সফল হবে। 

আব্দুল হাকিমের ছেলে রাকিব হোসাইন জানান, আমার বাবা একজন শিক্ষক। তিনি একজন প্রতিবন্ধী মানুষ হওয়ার পরেও দৈনন্দিন কাজ আমাদের থেকেও অনেক বেশি করেন। পেশাগত দ্বায়িত্ব, কৃষিকাজ, বাড়ির কাজ, আমার সঙ্গে ব্যবসায় সহযোগিতা করা- এসব কাজে তিনি এতো বেশি পরিশ্রম করেন, যা আমাদের সুস্থ মানুষের পক্ষে অনেক সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। সংসার জীবনে তার উন্নতির যে ধারা, তা পরিবারের জন্য গর্বের। 

স্থানীয় সোহাগ মামুন জানান, হাকিম ভাইয়ের হাত না থাকার পরেও তিনি ছোটবেলা থেকে কষ্ট করে হলেও তার লেখাপড়া চালিয়ে গেছেন। অভাব দারিদ্র্যতার মাঝে থেকেও তিনি পড়াশোনা করে আজ একজন সফল ব্যক্তির কাতারে। তিনি তার প্রত্যেক সন্তানকে সুশিক্ষিত করেছেন। তিনি একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হয়েও যতটা সংগ্রাম করে অগ্রসর হয়েছেন, অনেক সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব নয়, তিনি এলাকার গর্ব।  

আব্দুল হাকিম যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা এলাকাবাসীর জন্য গর্বের। প্রতিকূল অবস্থায় থেকে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আব্দুল হাকিমের যে অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা জানালেন উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা।  

ডোমার উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আফজালুল হক জানালেন, সর্বপ্রথম তার স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে আমি আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম তার দুই হাত নেই দেখে। এরপর দেখছি তিনি সব কাজ সুন্দরভাবে সামলে নিচ্ছেন। চাকরি জীবনের দায়িত্বের ব্যাপারে তিনি অনেক সিরিয়াস। আমরা এই সংগ্রামী ব্যক্তিকে সম্মানিত করে সমাজের পিছিয়ে পড়াদের অনুপ্রাণীত করতে চাই। 

ডোমার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শায়লা সাঈদ তন্বী জানান, শিক্ষক আব্দুল হাকিমের কার্যক্রম দেখে আমাদের সকলের অনুপ্রেরণা পাওয়া উচিত। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আল্লাহ যেন তাকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সুস্থ রাখেন এবং ভালোভাবে চলার সামর্থ্য দেন।

প্রতিনিধি/এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর