শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ততা বাড়লেও মজুরি নিয়ে হতাশ কারিগররা

সুমন চন্দ্র, দিনাজপুর
প্রকাশিত: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০৬ পিএম

শেয়ার করুন:

প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ততা বাড়লেও মজুরি নিয়ে হতাশ কারিগররা

কাঁদামাটি, খড় আর বাঁশের কাঠামোয় ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে দেবী দুর্গার প্রতিচ্ছবি। কারও হাতে মাটির প্রলেপ, কেউ ব্যস্ত প্রতিমার মুখাবয়ব তৈরিতে, আবার কেউ রঙ-তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলছেন দেবী ও তার পরিবারের সদস্যদের রূপ। কোথাও চলছে প্রতিমার কাঠামো তৈরির কাজ, কোথাও চলছে শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জা। দিন-রাতের পরিশ্রমে মাটির প্রতিমায় প্রাণবন্ত রূপ দিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন দিনাজপুরের প্রতিমাশিল্পীরা।

আর কয়েকদিন পরই শুরু হবে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। উৎসবকে ঘিরে জেলার বিভিন্ন মন্দির ও পূজামণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। পূজার দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে প্রতিমা তৈরির কারিগরদের ব্যস্ততা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নিরলস পরিশ্রম করছেন তারা।

প্রতিমা তৈরির প্রতিটি ধাপেই রয়েছে শিল্পীদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতার ছাপ। প্রথমে বাঁশ ও খড় দিয়ে তৈরি করা হয় প্রতিমার মূল কাঠামো। এরপর সুতলি দিয়ে বেঁধে কাঠামোটি মজবুত করা হয়। তাতে কয়েক দফায় দেওয়া হয় কাঁদামাটির প্রলেপ। মাটি শুকিয়ে গেলে শুরু হয় প্রতিমার অবয়ব ও মুখাবয়ব নিখুঁত করার কাজ। সবশেষে রঙ-তুলির আঁচড়ে মাটির কাঠামো পায় দেবী দুর্গাসহ তাঁর পরিবারের সদস্যদের পূর্ণাঙ্গ রূপ।

শুধু দুর্গাপ্রতিমা নয়, পূজামণ্ডপের জন্য তৈরি করা হচ্ছে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ ও অসুরের প্রতিমাও। পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে সিংহ, মহিষ, পেঁচা, হাঁস ও সর্পসহ বিভিন্ন অনুষঙ্গ। প্রতিটি প্রতিমার গড়ন, নকশা ও সাজসজ্জায় থাকে আলাদা যত্ন। একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিমাসেট তৈরি করতে দিনের পর দিন শ্রম দিতে হয় কারিগরদের। প্রতিমার আকার, নকশা ও আয়োজকদের চাহিদা অনুযায়ী কাজ শেষ করতে সময়ও কমবেশি লাগে।

Dinajpur-3

দিনাজপুর শহরের বিভিন্ন মন্দির ও প্রতিমা তৈরির কারখানা ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও বাঁশ-খড়ের কাঠামো তৈরিতে ব্যস্ত কারিগররা, কোথাও চলছে কাঁদামাটির প্রলেপ দেওয়ার কাজ। আবার কোনো কোনো কর্মশালায় প্রতিমার রঙ ও সাজসজ্জার শেষ ধাপ চলছে। পূজার সময় ঘনিয়ে আসায় কাজের চাপও বেড়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা তৈরি করে মণ্ডপে পৌঁছে দিতে ব্যস্ততার ফাঁকে বিশ্রামের সুযোগও কম পাচ্ছেন শিল্পীরা।

প্রতিমা তৈরি কারিগরদের কাছে দুর্গাপূজা যেমন আনন্দের, তেমনি জীবিকা নির্বাহেরও গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। বছরের এই সময়ে কাজের চাপ বাড়লেও উপকরণের দাম বৃদ্ধি এবং সেই অনুপাতে পারিশ্রমিক না বাড়ায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন অনেকে।

প্রতিমাশিল্পী বিরেন নাথ বলেন, এবার আমি ১২টি পূজামণ্ডপের প্রতিমা তৈরির কাজ নিয়েছি। এরই মধ্যে ১০টির কাজ শেষ করেছি। বাকি দুটি মণ্ডপের প্রতিমা তৈরির কাজ চলছে।

তিনি আরও বলেন, দ্রব্যমূল্য বাড়লেও পূজা উদ্‌যাপন কমিটিগুলো বাজেট বাড়াচ্ছে না। প্রতিমা তৈরির প্রয়োজনীয় উপকরণ কিনে কাজ করার পর খুব একটা লাভ থাকে না। একটি পূর্ণাঙ্গ দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করতে প্রায় দুই মাস বা তারও বেশি সময় লাগে। মণ্ডপের আকার, প্রতিমার নকশা ও আয়োজকদের চাহিদার ওপর নির্ভর করে কাজ শেষ করতে কমবেশি সময় লাগে। পূজা ঘনিয়ে আসায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে এখন দিন-রাত পরিশ্রম করতে হচ্ছে।

আরেক প্রতিমাশিল্পী সবুজ চন্দ্র সেন বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতিমা তৈরির খরচও আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে মজুরি বাড়েনি। ফলে এত পরিশ্রম করেও এবার তেমন একটা লাভ হবে না।

Dinajpur-1

প্রতিমাশিল্পী নরেশ পাল বলেন, দুর্গাপূজার প্রতিমা তৈরি আমাদের কাছে শুধু পেশা নয়, এটি শিল্প ও ঐতিহ্যের অংশ। একটি কাঠামোকে ধীরে ধীরে মাটি দিয়ে প্রতিমার রূপ দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত সেটিকে সুন্দর করে তোলা অনেক পরিশ্রমের কাজ। তবে প্রতিমা তৈরির পর মানুষের আনন্দ দেখে আমাদের পরিশ্রম সার্থক মনে হয়।

পূজার সূচি অনুযায়ী, আগামী ১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। এরপর ১৫ অক্টোবর মহাপঞ্চমী, ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠী, ১৭ ও ১৮ অক্টোবর মহাসপ্তমী, ১৯ অক্টোবর মহাঅষ্টমী, ২০ অক্টোবর মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমী অনুষ্ঠিত হবে।

এবার দিনাজপুর জেলার ১৩টি উপজেলায় ১ হাজার ২৫৩টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা উদ্‌যাপনের প্রস্তুতি চলছে। পূজাকে ঘিরে জেলার বিভিন্ন এলাকায় মণ্ডপ সাজানো, আলোকসজ্জা ও অন্যান্য আয়োজনের কাজ এগিয়ে চলছে। একই সঙ্গে ব্যস্ততা বেড়েছে প্রতিমাশিল্পীদের কর্মশালায়।

Dinajpur-2

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি স্বরূপ বকসী বাচ্চু বলেন, শারদীয় দুর্গাপূজা সুষ্ঠুভাবে পালনের লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন একাধিকবার বৈঠক করেছে। আমরা ইতোমধ্যে জেলার সকল পূজা মন্ডপে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে চিঠি দিয়েছি। পাশাপাশি প্রতিটি পুজা মন্ডপে স্বেচ্ছাসেবক টিম গঠন করা হয়েছে।

 

নিরাপত্তার বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) আনোয়ার হোসেন বলেন, দুর্গাপূজাকে ঘিরে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পূজার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পূজা উদযাপন কমিটিসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

প্রতিনিধি/টিবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর