ইউটিউবে ভিডিও দেখে শখের বসে শুরু করেছিলেন কেঁচো সার বা ভার্মিকম্পোস্ট উৎপাদন। কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও ইচ্ছা, পরিশ্রম ও স্বামীর সহযোগিতায় সেই উদ্যোগ এখন পরিণত হয়েছে সফল খামারে। রাজবাড়ী সদর উপজেলার বসন্তপুর ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের নারী উদ্যোক্তা সাবানা খাতুন এখন প্রতি মাসে উৎপাদন করছেন ৫০ থেকে ৬০ মণ ভার্মিকম্পোস্ট। তার উৎপাদিত জৈব সার বিক্রি হচ্ছে রাজবাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।
সাবানা খাতুনের এই উদ্যোগের শুরু ২০২৪ সালে। ইউটিউবে কেঁচো দিয়ে জৈব সার উৎপাদনের একটি ভিডিও দেখে তিনি এ কাজে আগ্রহী হন। কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও নিজের উদ্যোগে ছোট পরিসরে ভার্মিকম্পোস্ট উৎপাদন শুরু করেন তিনি।
শুরুর দিকে নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়েন সাবানা। পরে স্থানীয় কৃষি বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ‘স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রজেক্ট’-এর আওতায় প্রযুক্তিগত সহায়তা হিসেবে তিনি পান ছয়টি রিং ও পাঁচ হাজার কেঁচো। এই সহায়তার পর তার খামার সম্প্রসারণের কাজ গতি পায়।
বর্তমানে সাবানার খামারে রয়েছে ২৫টি রিং, ১৬টি হাউস চেম্বার ও ৫৬টি ট্রে। সেখানে প্রায় দুই লাখ কেঁচোর মাধ্যমে প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপাদিত হচ্ছে ভার্মিকম্পোস্ট সার। স্বামী রাকিবুল ইসলামও শুরু থেকেই এ কাজে তাকে সহযোগিতা করে আসছেন।

সাবানা ও তার স্বামীর যৌথ প্রচেষ্টায় বর্তমানে খামারটিতে প্রতি মাসে ৫০ থেকে ৬০ মণ ভার্মিকম্পোস্ট উৎপাদিত হচ্ছে। প্রতি কেজি সার বিক্রি হচ্ছে ১৪ টাকা দরে। রাজবাড়ীর পাশাপাশি ফরিদপুর, মাগুরা ও পাবনাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষক ও পাইকাররা এ সার কিনছেন। এতে সংসারে এসেছে আর্থিক স্বচ্ছলতা।
নারী উদ্যোক্তা সাবানা খাতুন বলেন, ‘ইউটিউবে কেঁচো দিয়ে জৈব সার তৈরির ভিডিও দেখে আমারও এটি করার আগ্রহ তৈরি হয়। স্বামী রাকিবুল ইসলাম সবসময় পাশে থেকে সাহস দিয়েছেন। প্রথমে ছোট পরিসরে শুরু করলেও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। পরে স্থানীয় কৃষি অফিসে যোগাযোগ করলে তারা খামার বড় করতে সহযোগিতা করে। কৃষি অফিস থেকে রিং ও কেঁচো পাওয়ার পর খামারটি দাঁড় করানো সহজ হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন নিয়মিত সার উৎপাদন হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকার ও কৃষকেরা সার নিতে আসছেন। সার বিক্রি করে সংসারে ভালো সচ্ছলতা এসেছে। আমার মতো অন্য নারীরাও যদি ইচ্ছা ও মনোবল নিয়ে কিছু শুরু করেন, তাহলে তারাও নিজ পায়ে দাঁড়াতে পারবেন।’
সাবানার স্বামী রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘আমার স্ত্রী ইউটিউব দেখে কেঁচো দিয়ে জৈব সার তৈরির আগ্রহ দেখানোর পর থেকেই আমি তাকে উৎসাহ দিয়ে আসছি। শুরুতে অনেকে অনেক কথা বললেও সে নিজের জেদ ও পরিশ্রমে পিছপা হয়নি। পরে কৃষি বিভাগ থেকে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও পরামর্শ পাওয়ার পর কাজের গতি আরও বেড়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের খামারে প্রতি মাসে প্রচুর পরিমাণে ভার্মিকম্পোস্ট উৎপাদন হচ্ছে, যা রাজবাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার চাহিদা মেটাচ্ছে। এই উদ্যোগে আমাদের সংসারে যেমন আর্থিক সচ্ছলতা এসেছে, তেমনি এলাকার কৃষকেরাও জৈব সার ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন।’
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মোস্তাক খান বলেন, ‘সাবানা খাতুন শুরু থেকেই ভার্মিকম্পোস্ট উৎপাদনে অত্যন্ত পরিশ্রমী ও আগ্রহী ছিলেন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে ‘স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রজেক্ট’-এর আওতায় তাকে প্রযুক্তিগত সহায়তা, রিং ও কেঁচো দেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে তার উদ্যোগ সফল করতে নিয়মিত তদারকি ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে তাঁর খামারে উৎপাদিত জৈবসারের গুণগত মান ভালো। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে তা দেশের বিভিন্ন এলাকাতেও যাচ্ছে। রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈবসারের বিস্তারে সাবানার মতো উদ্যোক্তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।’
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জনি খান বলেন, ‘কৃষিতে রাসায়নিক সারের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে এবং মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জৈবসারের ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। রাজবাড়ীর সদর উপজেলায় নারী উদ্যোক্তা সাবানা খাতুন ভার্মিকম্পোস্ট উৎপাদনের মাধ্যমে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।’
তিনি বলেন, ‘কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় মাঠপর্যায়ের উদ্যোক্তাদের কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সাবানার খামারের উৎপাদিত সার স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকাতেও যাচ্ছে। এ ধরনের উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি টেকসই কৃষি উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছে।’
কৃষিতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈবসারের প্রসারে সাবানা খাতুনের মতো নারী উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। তার সাফল্য অন্য নারীদেরও কৃষিভিত্তিক উদ্যোগে আগ্রহী করে তুলছে।
প্রতিনিধি/এসএস




