নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় দেড় বছর আগে। এরপরও শেষ হয়নি চুয়াডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশনের আধুনিকায়ন ও নতুন দ্বিতল স্টেশন ভবন নির্মাণের কাজ। কয়েক দফা কাজ বন্ধ থাকার পর বর্তমানে আবারও নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। প্ল্যাটফর্মের কাজ অনেকটা শেষের দিকে এলেও নতুন স্টেশন ভবনের কাজ চলছে ধীরগতিতে। এরই মধ্যে প্রকল্পের মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে পুরো কাজ শেষ করার আশা করছেন তারা।
তবে দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ চলায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের। পুরোনো প্ল্যাটফর্ম ও স্টেশন ভবনের বিভিন্ন অংশ ভেঙে ফেলায় পর্যাপ্ত বসার জায়গা, যাত্রী বিশ্রামাগার ও প্রয়োজনীয় শৌচাগারের সুবিধা পাচ্ছেন না তারা। মূল ভবনের বাইরে অস্থায়ী টিকিট কাউন্টার চালু থাকায় বিশেষ করে নতুন ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা যাত্রীরা পড়ছেন বিভ্রান্তিতে। সংকট রয়েছে স্টেশনের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনাতেও।

চুয়াডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশন। বর্তমান বাংলাদেশের রেল যোগাযোগের ইতিহাসের সঙ্গেও চুয়াডাঙ্গা জেলার রয়েছে গভীর সম্পর্ক। ১৮৬২ সালে দর্শনা থেকে কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত রেলপথ চালুর মধ্য দিয়ে বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে রেল যোগাযোগের সূচনা হয়। প্রায় ১৬৪ বছরের পুরোনো সেই ঐতিহাসিক রেলপথের গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন চুয়াডাঙ্গা।
দীর্ঘদিনের পুরোনো ও জরাজীর্ণ অবকাঠামোর পরিবর্তে আধুনিক যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে ২০২৩ সালে চুয়াডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশন আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। নতুন দ্বিতল স্টেশন ভবন, প্রশস্ত প্ল্যাটফর্ম, প্ল্যাটফর্মে ছাউনি, যাত্রীদের অপেক্ষার স্থানসহ বিভিন্ন আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১০ কোটি ১৮ লাখ টাকা।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরটিসি ও এসএইচজে জয়েন্ট ভেঞ্চারের চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী কাজ শেষ করার জন্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫৪০ দিন। সে হিসাবে ২০২৫ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই প্রকল্পের মূল মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষেও পুরো কাজ শেষ হয়নি।
_20260929_145237214.jpg)
সরেজমিনে দেখা গেছে, স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম নির্মাণকাজ অনেকটাই এগিয়েছে। নতুন প্ল্যাটফর্মে ছাউনির ব্যবস্থাও করা হয়েছে। তবে নতুন দ্বিতল স্টেশন ভবনের নির্মাণকাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। কোথাও প্লাস্টার, কোথাও টাইলস, আবার কোথাও রং ও ফিনিশিংয়ের কাজ বাকি রয়েছে। নির্মাণকাজের কারণে স্টেশনের বিভিন্ন অংশে এখনো অস্থায়ী ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যাত্রীসেবা দিতে হচ্ছে।
দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্পের কাজ চলায় প্রতিদিন স্টেশন ব্যবহারকারী যাত্রীদের দুর্ভোগও দীর্ঘ হচ্ছে। পুরোনো প্ল্যাটফর্ম ও অবকাঠামোর অনেক অংশ ভেঙে ফেলার পর পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা তৈরি না হওয়ায় ট্রেনের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে ট্রেন বিলম্বিত হলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
যাত্রীদের অভিযোগ, আধুনিক স্টেশন নির্মাণের কাজ চললেও নির্মাণকালীন সময়ে তাদের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়নি। পর্যাপ্ত বসার স্থান না থাকায় অনেককে দাঁড়িয়ে কিংবা অস্বস্তিকর পরিবেশে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা স্টেশনের যাত্রী সৈয়দ আবু জাফর বলেন, স্টেশনটি আধুনিক হচ্ছে, এটা অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু কাজটি দীর্ঘদিন ধরে চলায় যাত্রীদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। ট্রেনের জন্য অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়, অথচ বসার পর্যাপ্ত জায়গা নেই। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ ও নারী-শিশুদের বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। আমরা চাই দ্রুত কাজ শেষ করে যাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা চালু করা হোক।
_20260929_145249392.jpg)
আরেক যাত্রী আলমগীর হোসেন বলেন, কাজ শুরু হওয়ার সময় আমরা ভেবেছিলাম নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই একটি সুন্দর ও আধুনিক স্টেশন পাব। কিন্তু কয়েক বছর ধরে কাজ চলছেই। এখনো ভবন পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি। নির্মাণকাজ চলতে পারে, কিন্তু সেই সময় যাত্রীদের বসার জায়গা, টয়লেট ও টিকিট সংগ্রহের ব্যবস্থা যেন সহজ থাকে, সেটাও কর্তৃপক্ষের দেখা উচিত।
সবচেয়ে বেশি অভিযোগ রয়েছে স্টেশনের শৌচাগার ব্যবস্থা নিয়ে। পর্যাপ্ত ও ব্যবহার উপযোগী শৌচাগারের অভাবে দীর্ঘ যাত্রার আগে-পরে যাত্রীদের বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে নারী যাত্রী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য বিষয়টি আরও কষ্টকর হয়ে উঠেছে।
যাত্রী শাহনাজ পারভীন বলেন, স্টেশনে একজন নারী যাত্রীর জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে পরিষ্কার ও নিরাপদ টয়লেট এবং বসার জায়গা। কিন্তু নির্মাণকাজের কারণে এখন এসব সুবিধা খুবই সীমিত। বাচ্চা বা বয়স্ক কাউকে নিয়ে এলে সমস্যাটা আরও বেশি বোঝা যায়।
নির্মাণকাজের কারণে স্টেশনের টিকিট ব্যবস্থাপনাতেও তৈরি হয়েছে ভোগান্তি। মূল স্টেশন ভবনের বাইরে অস্থায়ীভাবে টিকিট কাউন্টার তৈরি করা হয়েছে। ফলে অনেক যাত্রী স্টেশনের ভেতরে প্রবেশ করার পর জানতে পারেন টিকিট সংগ্রহ করতে আবার বাইরে যেতে হবে।
বিশেষ করে যারা প্রথমবার চুয়াডাঙ্গা স্টেশন ব্যবহার করছেন, তাদের অনেকেই অস্থায়ী টিকিট কাউন্টারের অবস্থান সহজে বুঝতে পারেন না। ট্রেন ছাড়ার অল্প সময় আগে স্টেশনে পৌঁছানো যাত্রীদের ক্ষেত্রে এতে তাড়াহুড়া ও বিভ্রান্তি আরও বেড়ে যায়।
_20260929_145313203.jpg)
নতুন ভবনের নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় শুধু যাত্রীসেবা নয়, স্টেশনের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনাতেও সমস্যা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, নথিপত্র ও দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার জন্য পুরোনো ও সীমিত জায়গার কক্ষ ব্যবহার করতে হচ্ছে। একদিকে নতুন ভবনের কাজ চলছে, অন্যদিকে একই পরিবেশে স্টেশনের নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হচ্ছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।
চুয়াডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মিজানুর রহমান বলেন, নির্মাণকাজ চলমান থাকায় স্বাভাবিকভাবেই যাত্রীসেবা ও আমাদের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। পুরোনো ব্যবস্থার মধ্যেই সীমিত জায়গায় অফিসের কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। যাত্রীদের বসার স্থান, টিকিট সংগ্রহ এবং অন্যান্য সুবিধার ক্ষেত্রেও সাময়িক অসুবিধা রয়েছে। আমরা যতটা সম্ভব বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যে যাত্রীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। নতুন ভবন ও অন্যান্য কাজ শেষ হলে এসব সমস্যা আর থাকবে না এবং যাত্রীসেবার মানও অনেক উন্নত হবে।
যাত্রীদের প্রত্যাশা, কেবল নতুন ভবন নির্মাণ করলেই আধুনিকায়নের উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। স্টেশনটি যেন বাস্তব অর্থেই যাত্রীবান্ধব হয়, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত বসার স্থান, পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক শৌচাগার, নিরাপদ অপেক্ষাগার, সহজে দৃশ্যমান টিকিট কাউন্টার এবং প্রয়োজনীয় তথ্যসেবা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
একই সঙ্গে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অস্থায়ীভাবেও পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা, ব্যবহার উপযোগী শৌচাগার ও সহজ টিকিটসেবা নিশ্চিত করার দাবি রয়েছে যাত্রীদের।
নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও কাজ শেষ না হওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন জটিলতার কারণে মাঝখানে নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল। পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে এবং বর্তমানে আবার কাজ চলছে।
চুয়াডাঙ্গা রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং নকশা-সংক্রান্ত কিছু জটিলতার কারণে মাঝখানে নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল। এখন আবার নিয়মিত কাজ চলছে। ভবনের মূল কাঠামোর কাজ অনেকটাই হয়ে গেছে। বর্তমানে প্লাস্টার, টাইলস, রঙসহ ফিনিশিংয়ের কিছু কাজ বাকি রয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে পুরো কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করছি।
প্রতিনিধি/টিবি




