সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল

হাজারো রোগীর ভিড়, চিকিৎসক মাত্র ২২ জন

মো. আল-আমিন, শরীয়তপুর
প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৮ পিএম

শেয়ার করুন:

হাজারো রোগীর ভিড়, চিকিৎসক মাত্র ২২ জন

দূর-দূরান্ত থেকে ভোরেই ছুটে আসেন মানুষ। কারও হাতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাগজ, কারও চোখে স্বজনকে সুস্থ করে বাড়ি ফেরানোর আকুতি। বহির্বিভাগের সামনে বাড়তে থাকে রোগীর সারি। জরুরি বিভাগেও থামে না রোগীর আসা-যাওয়া। কেউ চিকিৎসকের অপেক্ষায়, কেউ শয্যার অপেক্ষায়। আবার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার প্রয়োজন হলে অনেককেই যেতে হয় অন্য হাসপাতালে।

শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের প্রতিদিনের চিত্র যেন এমনই। জেলার হাজারো মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল এই সরকারি হাসপাতালটি নিজেই এখন জনবল সংকটে ‘অসুস্থ’। বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সীমিতসংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও কারিগরি কর্মী।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগ মিলিয়ে গড়ে দেড় থেকে দুই হাজার মানুষ চিকিৎসা নিতে আসেন। হাসপাতালে ভর্তি থাকেন প্রায় ৪৫০ রোগী। অথচ ৭২টি অনুমোদিত চিকিৎসক পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২২ জন।

ফলে একদিকে রোগীর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে সীমিতসংখ্যক চিকিৎসককে সামলাতে হচ্ছে একাধিক দায়িত্ব। কোথাও চার-পাঁচজন চিকিৎসকের প্রয়োজন হলেও একজনকে দিয়েই দায়িত্ব চালানোর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এতে চিকিৎসকদের ওপর যেমন বাড়ছে অতিরিক্ত চাপ, তেমনি চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষকেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

কাগজে ২৫০, জনবলে ১০০ শয্যার কাঠামো
হাসপাতাল সূত্র জানায়, কাগজে-কলমে শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল ২৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও এখনো ১০০ শয্যার জনবল কাঠামো অনুযায়ী এর কার্যক্রম চলছে। এর মধ্যে চিকিৎসকদের কেউ পদোন্নতি, কেউ প্রেষণসহ বিভিন্ন কারণে অন্যত্র দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে অনুমোদিত পদের তুলনায় বাস্তবে রোগীসেবায় পাওয়া যাচ্ছে অনেক কম চিকিৎসক।

সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দিয়েছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসায়। শিশু, নাক-কান-গলা, চক্ষু ও হৃদরোগ বিভাগে নেই প্রয়োজনীয় কনসালট্যান্ট বা চিকিৎসক। ১১টি সিনিয়র কনসালট্যান্টের অনুমোদিত পদের বিপরীতে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন।

ফলে জটিল রোগ নিয়ে হাসপাতালে আসা অনেক রোগীকে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতাল বা জেলার বাইরে যেতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে চিকিৎসার খরচ, সময় ও ভোগান্তি।

নার্স সংকটেও চাপে সেবা
শুধু চিকিৎসক নয়, নার্স সংকটও হাসপাতালের চিকিৎসাসেবাকে চাপে ফেলেছে। ৯২টি অনুমোদিত নার্স পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৫৯ জন। তাদের মধ্যেও কেউ প্রেষণে, কেউ মাতৃত্বকালীন ছুটিতে এবং কেউ অবসর-পরবর্তী ছুটিতে (পিআরএল) থাকায় বাস্তবে কর্মরত নার্সের সংখ্যা আরও কম।

একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক রোগী সামলাতে গিয়ে কর্মরত নার্সদেরও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, কখনো কখনো কাঙ্ক্ষিত সময় ও মনোযোগ পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের কাছে দীর্ঘ অপেক্ষা যেন এখন নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে বহির্বিভাগে চিকিৎসকের কক্ষের সামনে সকাল থেকেই দেখা যায় দীর্ঘ সারি। সীমিতসংখ্যক চিকিৎসকের পক্ষে একসঙ্গে এত রোগীকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

চিকিৎসা নিতে আসা শিল্পী আক্তার বলেন, চিকিৎসা নিতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এত রোগীর বিপরীতে মাত্র ২২ জন চিকিৎসক দিয়ে সদর হাসপাতালের সেবা চালানো কঠিন। চিকিৎসকরাও চাপে থাকেন, রোগীরাও ভোগান্তিতে পড়েন। আমরা দ্রুত পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিয়োগের দাবি জানাই।

চিকিৎসকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মিতু বলেন, রোগীর যে চাপ, সেই তুলনায় পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় সেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

চিকিৎসা নিতে রোগীদের দীর্ঘ সারি। ছবি: ঢাকা মেইল
চিকিৎসা নিতে রোগীদের দীর্ঘ সারি। ছবি: ঢাকা মেইল

 

জনবল সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেছেন শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মাদ আকরাম এলাহী। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো সংকটের সমাধান হয়নি। হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় জনবল পদায়নের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

শেষ ভরসাটুকুও যেন সংকটে
শরীয়তপুরের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের কাছে সদর হাসপাতাল শুধু একটি চিকিৎসাকেন্দ্র নয়, এটি অনেকের শেষ ভরসা। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যয় বহন করা সম্ভব না হওয়ায় অসুস্থ শরীর নিয়ে প্রতিদিন এখানে ছুটে আসেন জেলার বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ।

কিন্তু সেই ভরসার জায়গাটিই যখন জনবল সংকটে ধুঁকতে থাকে, তখন সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন সাধারণ রোগীরা। চিকিৎসক সংকটের কারণে দীর্ঘ অপেক্ষা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার জন্য অন্যত্র যাওয়া কিংবা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার বাড়তি ব্যয়— সবকিছুর চাপ এসে পড়ে তাদের ওপর।

স্থানীয়দের দাবি, রোগীর চাপ ও হাসপাতালের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত প্রয়োজনীয়সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ান নিয়োগ দিতে হবে। একই সঙ্গে শিশু, চক্ষু, নাক-কান-গলা ও হৃদরোগসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদায়ন করতে হবে।

কারণ, প্রতিদিন যখন হাজারো মানুষ চিকিৎসার আশায় একটি সরকারি হাসপাতালে এসে দাঁড়ান, তখন সেখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকা শুধু একটি জনবল সংকট নয়— এটি সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার ও ভরসার সঙ্গেও জড়িয়ে থাকা একটি বড় প্রশ্ন।

প্রতিনিধি/এলএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর