ইলিশের ভরা মৌসুমেও শরীয়তপুরের পদ্মায় কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা মিলছে না। দিন-রাত নদীতে জাল ফেলেও আশানুরূপ মাছ পাচ্ছেন না জেলেরা। ফলে একদিকে যেমন তাদের আয়-রোজগার কমেছে, অন্যদিকে তেমনি প্রাণচাঞ্চল্য হারিয়েছে নদীপাড়ের মৎস্যঘাটগুলো। ইলিশের আশায় নদীতে ছুটে চলা প্রায় ৫ হাজার জেলে এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) শরীয়তপুরের পদ্মার বিভিন্ন ঘাট ও নদী এলাকা ঘুরে এবং জেলে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
স্থানীয়রা জানান, গত দুই বছরে পদ্মার মাঝপথে বেশ কয়েকটি বড় ডুবোচর জেগে উঠেছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের পথ বদলে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নতুন নতুন চ্যানেল। কোথাও পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়েছে, কোথাও আবার স্রোতের গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ইলিশের বিচরণ ও আহরণেও।
জেলেদের ভাষ্য, আগে নদীর নির্দিষ্ট কিছু স্থানে জাল ফেললেই ইলিশ পাওয়া যেত। এখন সেই জায়গাগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল ফেলেও কাঙ্ক্ষিত মাছ মিলছে না। নদীর গভীরতা ও স্রোতের পরিবর্তনের সঙ্গে ইলিশের চলাচলের পথও বদলে গেছে বলে মনে করছেন তারা।

নড়িয়ার সুরেশ্বর ঘাট, জাজিরার পালেরচর বাজারসহ কয়েকটি মৎস্যঘাট ঘুরে দেখা যায়, আগের মতো নেই জেলে ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড়। বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা এলেও পর্যাপ্ত ইলিশ না পাওয়ায় অনেকেই খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন। ফলে জমে উঠছে না মৎস্যঘাটের ব্যবসা।
মাওয়া ঘাটের জেলে রফিক মাঝি ও আয়নাল সরদার বলেন, তিন দশক ধরে পদ্মায় মাছ ধরছেন তারা। আগে কয়েক ঘণ্টা জাল ফেললেই বড় আকারের ইলিশসহ ভালো পরিমাণ মাছ পাওয়া যেত। এখন সারাদিন নদীতে থেকেও আগের তুলনায় অনেক কম মাছ মেলে। এতে আয় কমে যাওয়ায় সংসার চালাতে বিকল্প কাজের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
তাদের মতে, নদীর মাঝখানে চর জেগে ওঠা এবং স্রোতের গতিপথ পরিবর্তনের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণও কমে গেছে।
কাঁচিকাটা ঘাটের আড়ত মালিক দেওয়ান ফকির বলেন, জেলেরা নদীতে গিয়ে পর্যাপ্ত মাছ না পাওয়ায় আড়তেও তার প্রভাব পড়েছে। মাছ কম থাকায় পাইকাররা আগের মতো আসছেন না। কেউ এলেও পর্যাপ্ত মাছ না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা ও মেঘনা নদীবেষ্টিত শরীয়তপুর জেলায় মোট ৭১ কিলোমিটার নদীপথ রয়েছে। এর মধ্যে নড়িয়া উপজেলার ৫ কিলোমিটার এবং ভেদরগঞ্জ উপজেলার ১৫ কিলোমিটারসহ মোট ২০ কিলোমিটার নদী এলাকা ইলিশের অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে নদীর স্বাভাবিক গভীরতা ও প্রবাহ ঠিক না থাকলে শুধু ইলিশ নয়, দেশীয় অন্যান্য মাছের বিচরণ ও প্রজনন ক্ষেত্রও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব বলেন, শরীয়তপুরের পদ্মা অংশে একসময় ইলিশের ব্যাপক বিচরণ ছিল। বর্তমানে নদীর গভীরতা ও প্রবাহের পরিবর্তনের কারণে সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। নদীর নাব্যতা সংকটের প্রভাব ইলিশের চলাচলের ওপরও পড়ছে।
তিনি বলেন, শরীয়তপুরে পদ্মার প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকাকে ইলিশের অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে। ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং পরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে চর ও পলি অপসারণ জরুরি।
প্রতিনিধি/টিবি




