চা-বাগান ও পাহাড়ঘেরা মৌলভীবাজারে রয়েছে ৫৩ হাজার ১০৯ একর সংরক্ষিত বনভূমি। এসব বন থেকে প্রায়ই উধাও হচ্ছে মূল্যবান গাছ। বন থেকে চুরি করা গাছ, সড়কের পাশের গাছ, সামাজিক বনায়নের গাছ কিংবা চা-বাগানের ছায়াবৃক্ষ সবই শেষ পর্যন্ত ঠাঁই পাচ্ছে জেলার বিভিন্ন করাতকলে। বৈধ কাঠের সঙ্গে অবৈধ কাঠ চেরাই হওয়ায় একপর্যায়ে আলাদা করে চোরাই কাঠ শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বন আইন অনুযায়ী কোনো করাতকল মালিক লাইসেন্স না নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন না। লাইসেন্স নেওয়ার পর প্রতিবছর নবায়ন করতে হয়। করাতকল স্থাপনের জন্য বন বিভাগের লাইসেন্স পাওয়ার পর পরিবেশ অধিদপ্তর থেকেও ছাড়পত্র নিতে হয়। এসব কাগজপত্র ছাড়া করাতকল স্থাপন করা যাবে না।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত মৌলভীবাজার জেলায় মোট ১৯৩টি করাতকল রয়েছে। এর মধ্যে ১৪২টি লাইসেন্স রয়েছে। লাইসেন্সবিহীন করাতকল রয়েছে ১৩ টি। উচ্চ আদালতে রিট ও স্বত্বসংক্রান্ত মামলার কারণে আরও ৪০ টি করাতকল পরিচালিত হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের বেলায় করাতকল গুলোতে বৈধ কাঠ চেরাইয়ের পাশাপাশি রাতেও কাঠ চেরাই করা হয়। বিশেষ করে চোরাই কাঠ করাতকলে আনার পর দ্রুত চেরাই করে ফেলা হয়। এতে কাঠের উৎস শনাক্ত করার সুযোগ কমে যায়।
স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, সংরক্ষিত বন, সড়কের পাশ এবং চা-বাগানের ছায়াবৃক্ষ থেকে গাছ কাটার প্রবণতা বাড়ছে। চুরি হওয়া এসব গাছ বিভিন্ন করাতকলে পৌঁছানোর পর চেরাই করে বাজারজাত করা হচ্ছে।
সম্প্রতি জেলার কমলগঞ্জ, রাজনগর ও শ্রীমঙ্গল উপজেলা ঘুরে দেখা যায় সংরক্ষিত বন ও রাস্তার পাশে অসংখ্য করাতকল রয়েছে। অধিকাংশ করাতকলের মালিক তাদের প্রতিষ্ঠানের বৈধতা, লাইসেন্স কিংবা পরিবেশ ছাড়পত্রের বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
তবে একাধিক করাতকল মালিকও স্বীকার করেন, জেলায় কিছু করাতকল লাইসেন্স ছাড়াই চলছে। আবার কিছু করাতকল উচ্চ আদালতে রিট বা স্বত্বসংক্রান্ত মামলা করে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব কাঠের মধ্যে বৈধ কাঠের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থান থেকে কেটে বা চুরি করে আনা কাঠও রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কাঠ ব্যবসায়ী ও করাতকলের কর্মী জানান, সড়কের পাশ, বনাঞ্চল কিংবা অন্যান্য স্থান থেকে গাছ কেটে অনেক সময় সরাসরি করাতকলে নিয়ে আসা হয়। বৈধ কাঠের সঙ্গে এসব কাঠও বিক্রি ও চেরাই করা হয়। কাঠ একবার করাতকলে চেরাই হয়ে গেলে সেটি কোন জায়গা থেকে এসেছে, তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ সুযোগেই চোরাই কাঠ বৈধ কাঠের সঙ্গে মিশে যায়।
পরিবেশকর্মী মহিদুল ইসলাম বলেন, বন উজাড়ের সঙ্গে করাতকলের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তবে সব করাতকলকে অবৈধ কাঠের সঙ্গে যুক্ত না করে লাইসেন্স, পরিবেশ ছাড়পত্র এবং কাঠের উৎস যাচাইয়ের মাধ্যমে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
বাপার জাতীয় পরিষদ সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, বন বিভাগের সংরক্ষিত এলাকার পাশাপাশি সড়ক, চা-বাগান ও সামাজিক বনায়নের গাছও যাতে নির্বিচারে করাতকলে না যায়, সে বিষয়ে নজরদারি বাড়াতে হবে। তা না হলে বনভূমি কমার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় প্রতিবেশ আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম বলেন, আমাদের কার্যালয়ে জনবল সংকট রয়েছে। এ কারণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। পরিবেশ অধিদফতর থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হলেও করাতকলের লাইসেন্স দেয় বন বিভাগ।
সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবদুর রহমান বলেন, গত কয়েক বছরে মৌলভীবাজারে বেশ কিছু লাইসেন্সবিহীন করাতকল বন্ধ করা হয়েছে। সম্প্রতি কমলগঞ্জেও একটি অবৈধ করাতকল বন্ধ করা হয়েছে। যেসব করাতকলের কাগজপত্র রয়েছে, সেগুলো প্রতিবছর নবায়ন করতে হয়। যেসব করাতকলের লাইসেন্স নেই, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চোরাই কাঠের বিষয়ে তিনি বলেন, কেউ চোরাই কাঠ বিক্রি বা চেরাই করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিনিধি/এআরএম




