শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি

নওগাঁর কৃষিতে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, লোকসানের শঙ্কা

সুমন আলী, নওগাঁ
প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৭ এএম

শেয়ার করুন:

নওগাঁর কৃষিতে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, লোকসানের শঙ্কা

ধানের জেলা হিসেবে খ্যাত উত্তর জনপদের নওগাঁর কৃষিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। এ অঞ্চলের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা সরাসরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল হলেও, জ্বালানি তেলের (ডিজেল) হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতি লিটার ডিজেলে ২০ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ডিজেলের মূল্য ১৩৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। বোরো, আমন কিংবা বিভিন্ন সবজি চাষ—সবক্ষেত্রেই এখানকার কৃষকদের ডিজেলচালিত সেচ ও যন্ত্রপাতির ওপর ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে। জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে ফসলভেদে কৃষকদের উৎপাদন খরচ ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম না পেলে কৃষকরা চাষাবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। আর এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার ওপর।

স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এমনিতেই সার, বীজ ও কীটনাশকের চড়া দামের বিপরীতে বাজারে ফসলের কাঙ্ক্ষিত মূল্য মিলছে না। এর ওপর ডিজেলের দাম বেড়ে ১৩৫ টাকা হওয়ায় তা তাদের জন্য ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে। কেবল সেচ দেওয়াই নয়; ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি চাষ, মই দেওয়া এবং পরিশেষে ধান মাড়াইয়ের প্রতিটি প্রক্রিয়াই এখন ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।

কৃষকদের হিসাব বলছে, সেচ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজে বিঘাপ্রতি যে পরিমাণ ডিজেল পোড়ে, তাতে শুধু সেচ বাবদই বিঘাপ্রতি ৮০০ থেকে ১,৫০০ টাকা পর্যন্ত খরচ বাড়বে। ডিজেল মূল্যবৃদ্ধির এই নেতিবাচক প্রভাব কেবল জমিতেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে উৎপাদিত ফসল ঘরে তোলা এবং বাজারে বিক্রি করার পুরো পরিবহন প্রক্রিয়াটিও এখন বাড়তি খরচের বড় এক যাতাকলে পড়েছে।

সব মিলিয়ে কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বিঘা জমিতে ধান বা অন্যান্য ফসল উৎপাদনে সামগ্রিক খরচ আগের তুলনায় ১,৫০০ থেকে ২,৫০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত গুনতে হতে পারে, যা প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করবে। ফসল ফলানোর পর শেষ পর্যন্ত তার ন্যায্য দাম মিলবে কি না, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তায় নওগাঁর প্রান্তিক চাষিরা।

সদর উপজেলার হাসাইগাড়ী এলাকার কৃষক রহিম উদ্দিন বলেন, কীটনাশক আর বীজের দাম তো আগেই বাড়ছিল। এরপর কৃত্রিম সংকটে চড়া দামে সার কিনতে হলো। আর এখন ডিজেলের দাম বেড়ে ১৩৫ টাকা হওয়ায় জমি চাষ থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত প্রতিটা পদক্ষেপে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে। বাজারে ফসলের দাম তো আর সেই অনুপাতে বাড়ে না। খরচ যেভাবে বাড়ছে, তাতে আগামীতে বোরো ধান লাগানোর সাহস আর থাকবে না। জমি ফেলেই রাখা লাগবে।

Capture

মহাদেবপুর উপজেলার চকউরমপুর এলাকার কৃষক সোলায়মান আলী জানান, আমাদের এলাকার মাঠগুলো একটু উঁচুতে হওয়ায় এমনিতেই বেশি পানি লাগে। আগে বিঘাপ্রতি জমিতে সেচ আর চাষ দিতে যে খরচ হতো, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আমরা গরিব মানুষ, সার-বীজের দাম সামলে তেলের এই বাড়তি খরচ দেবো কোথায় থেকে?’

রানীনগর উপজেলার কৃষক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, আমরা গরিব মানুষ, জমি বর্গা নিয়ে যা ফলাই, তার অর্ধেকই চলে যায় চাষ আর সেচ খরচে। এর মধ্যে ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে ট্রাক্টরওয়ালা থেকে শুরু করে পাম্পের মালিক—সবাইকে বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে। বিঘাপ্রতি খরচ যেভাবে দাঁড়াল, তাতে ধান কাটার আগেই লোকসানের হিসাব চোখের সামনে ভাসছে।

মান্দা উপজেলার গণেশপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল কাদের হিরা বলেন, সবকিছুর দাম বাড়লেও শুধু ধানের দাম বাড়ে না। ধান চাষ থেকে শুরু করে ধান মাড়াই আর বাজারে নেওয়া—সব জায়গায় এখন শুধু খরচ আর খরচ। এভাবে খরচ বাড়তে থাকলে এই বাড়তি খরচ পুষিয়ে ফসলের ন্যায্য দাম কি বাজারে পাবো? সরকারের উচিত কৃষকদের বাঁচানোর জন্য ডিজেলের দাম কমানো।

এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে খুব সমস্যা হবে না। সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনা ও বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হয়। পাশাপাশি সেচ কাজে সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি। বিশেষ করে ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ও খরচসাশ্রয়ী সৌরবিদ্যুৎচালিত (সোলার ইরিগেশন) সেচ পাম্প ব্যবহারের ওপর আমরা জোর দেওয়া হচ্ছে।

সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) জেলা সমন্বয়ক জয়নাল আবেদিন মুকুল বলেন, নওগাঁর কৃষিপণ্য শুধু এ জেলার চাহিদা মেটায় না, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের জোগান দেয়। কিন্তু ডিজেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় কৃষকের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে। উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেলে চাষিরা একসময় চাষাবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার ওপর। তাই নওগাঁর কৃষি অর্থনীতি সচল রাখতে এবং প্রান্তিক কৃষকদের বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে কৃষি খাতে বিশেষ জ্বালানি ভর্তুকি বা সহজ শর্তে প্রণোদনা চালুর জোরালো দাবি জানাচ্ছি।

প্রতিনিধি/টিবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর