বইঠার ছন্দে ছন্দে কীর্তিনাশার জল কেটে এগিয়ে চলছিল একের পর এক নৌকা। কখনো তুমুল করতালি, কখনো উচ্ছ্বাসের চিৎকার— নদীর দুই পাড় যেন মুহূর্তেই পরিণত হয়েছিল উৎসবের মঞ্চে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নানা বয়সী মানুষের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে নদীর পাড়। গ্রামবাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য নৌকাবাইচকে ঘিরে তৈরি হয় এক প্রাণের মিলনমেলা।
শরীয়তপুর সদর উপজেলার কীর্তিনাশা নদীতে মাদকবিরোধী সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে আয়োজিত নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার ফাইনাল রাউন্ড ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) এমনই উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
ডোমসার ইউনিয়নের তেতুলিয়া থেকে রাজগঞ্জ ব্রিজ হেলিপ্যাড পর্যন্ত নদীপথে অনুষ্ঠিত হয় প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এ নৌকাবাইচে আমগ্রাম এক্সপ্রেস প্রথম, সাত সমাজ এক্সপ্রেস-১ দ্বিতীয় এবং মামা ভাগিনা এক্সপ্রেস তৃতীয় স্থান অর্জন করে।
আয়োজক কমিটি জানায়, তারেক রহমানের নির্দেশনায় তরুণ সমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখা এবং খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনের মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এ আয়োজন করা হয়েছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন এলাকার মোট ১৪টি নৌকা অংশ নেয়। প্রথম রাউন্ড অনুষ্ঠিত হয় ১৪ সেপ্টেম্বর এবং দ্বিতীয় রাউন্ড ১৮ সেপ্টেম্বর। এরপর শুক্রবার অনুষ্ঠিত হয় বহুল প্রতীক্ষিত ফাইনাল।

ফাইনালের দিন সকাল থেকেই কীর্তিনাশার দুই পাড়ে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, আবার কেউবা নৌকায় চড়ে নদীর মাঝ থেকে উপভোগ করেন প্রতিযোগিতা। বইঠার একসঙ্গে ওঠানামা আর মাঝিদের ছন্দময় হাঁকডাকে নদীর পরিবেশ হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।
নৌকা যতই ফিনিশিং লাইনের দিকে এগিয়ে যায়, ততই বাড়তে থাকে দর্শকদের উত্তেজনা। পছন্দের নৌকার জন্য করতালি আর উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে দুই পাড়। অনেকের কাছে এই আয়োজন ছিল শুধু প্রতিযোগিতা নয়, হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়ার সুযোগ।
নৌকাবাইচে অংশ নেওয়া নৌকার নিরাপত্তা এবং দর্শনার্থীদের সেবায় ছিল মেডিকেল টিম, ফায়ার সার্ভিস ও স্বেচ্ছাসেবকরা। প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় পুরস্কার। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারী নৌকার জন্য ছিল একটি করে ফ্রিজ। আর প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া প্রতিটি নৌকার জন্য দেওয়া হয় একটি করে টেলিভিশন।

আয়োজকদের ভাষ্য, তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে শুধু নিষেধাজ্ঞা বা সচেতনতামূলক প্রচার নয়, তাদের সুস্থ বিনোদন, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক-ঐতিহ্যবাহী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করাও জরুরি। নৌকাবাইচের মতো আয়োজন সেই সুযোগ তৈরি করে। এতে একদিকে যেমন : গ্রামীণ ঐতিহ্য টিকে থাকে, অন্যদিকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে তৈরি হয় পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্প্রীতি।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, মাদক একটি সামাজিক ব্যাধি। এর বিরুদ্ধে পরিবার, সমাজ ও তরুণ প্রজন্মকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনের পরিবেশ তৈরি করা গেলে তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা সম্ভব। নৌকাবাইচের মতো ঐতিহ্যবাহী আয়োজন সেই সামাজিক বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
অনুষ্ঠানে শরীয়তপুর সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ টিপুর সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি ছিলেন, শরীয়তপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাঈদ আহমেদ আসলাম। প্রধান বক্তা ছিলেন জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, বীরমুক্তিযোদ্ধা সরদার এ. কে. এম. নাসির উদ্দিন কালু।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও শরীয়তপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল হোসেন সরদার, জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন বাদল বেপারী, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি সিরাজুল হক মোল্লাসহ দলীয় নেতাকর্মীরা।
একসময় গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি নদী-খালেই দেখা যেত নৌকাবাইচের এমন আয়োজন। আধুনিকতার চাপে সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই কমে এসেছে। কীর্তিনাশার বুকে শুক্রবারের নৌকাবাইচ তাই শুধু একটি প্রতিযোগিতা ছিল না, ছিল ঐতিহ্যের সঙ্গে মানুষের নতুন করে মিলনের উপলক্ষ্য। বইঠার প্রতিটি টানে যেন ফিরে এসেছিল বাংলার চেনা সেই জলজ সংস্কৃতির আবহ— আর নদীর দুই পাড়ের মানুষের উচ্ছ্বাসে কীর্তিনাশা হয়ে উঠেছিল একদিনের উৎসবের নদী।
প্রতিনিধি/ এজে




