মালয়েশিয়ায় বছরের পর বছর ঘাম ঝরিয়েছেন। কষ্টের উপার্জনের টাকা জমিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন নিজের একটি বাড়ির। সেই স্বপ্নের ঠিকানাই একদিন দাঁড়িয়েছিল শরীয়তপুরের জাজিরার পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের আলমখার কান্দীতে। কিন্তু সেই স্বপ্নের বাড়ি আর নেই। চোখের পলকেই ভয়াল পদ্মা কেড়ে নিয়েছে প্রবাসী জুলহাস খানের পুরো বসতবাড়ি।
সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে তীব্র ভাঙনের মুখে পড়ে বাড়িটিতে ধস শুরু হয়। নদী ক্রমেই এগিয়ে আসতে থাকলে অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো ভবনটি পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। নিজের কষ্টার্জিত অর্থে গড়া বাড়িটি চোখের সামনে নদীতে হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে শোক ও উদ্বেগ।
শুধু জুলহাস খানের বাড়িই নয়, পদ্মার তীব্র ভাঙনে এখন অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে আলমখার কান্দীর আরও বহু পরিবার। কয়েক দিন ধরে এ এলাকায় ভাঙন তীব্র হয়েছে। নদীর প্রবল স্রোতে প্রতিদিনই ধসে পড়ছে পাড়ের মাটি। স্থানীয়দের দাবি, এরই মধ্যে প্রায় ২০০ মিটার বা তারও বেশি নদীর তীর বিলীন হয়ে গেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে বসতবাড়ি, দোকানপাট, ফসলি জমি ও স্থানীয় সড়ক। আতঙ্কে অনেকে ঘরের টিনের চাল, দরজা-জানালা, আসবাবপত্রসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ আবার পরিবার নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করছেন। দীর্ঘদিনের বসতভিটা হারানোর আশঙ্কায় অনেকেই রাত জেগে বাড়িঘর পাহারা দিচ্ছেন।
আলমখার কান্দীর বাসিন্দা আক্কাস মিয়া বলেন, ‘পদ্মা যেভাবে ভাঙছে, তাতে সামনে আরও অনেক বাড়িঘর নদীতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘দ্রুত ভাঙন ঠেকানো না গেলে ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়বে।’
আরও পড়ুন:
জাজিরায় পদ্মার ভাঙন আতঙ্কে ৪০০ পরিবার
জাজিরায় পদ্মার ভাঙন নতুন নয়। গত ১০ আগস্ট উপজেলার পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া কান্দি এলাকায় মাত্র কয়েক ঘণ্টায় প্রায় ১১০ মিটার নদীতীর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
ওই সময় অন্তত ১০টি বসতঘর ও ছয়টি দোকান সরিয়ে নিতে হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্থানীয়দের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ সড়কেরও বেশ কিছু অংশ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কাথুরিয়া এলাকায় ভয়াবহ ভাঙনের ১০ থেকে ১২ দিন আগেই নদীভাঙন শুরু হয়েছিল। পরে পানি ও স্রোত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিস্তীর্ণ নদীতীর চলে যায় পদ্মার গর্ভে।
ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করলেও নদীপাড়ের মানুষের আতঙ্ক কাটেনি।
কাথুরিয়ার পাশাপাশি পালেরচর ইউনিয়নের ফরাজীকান্দি এবং পূর্ব নাওডোবার পৈলান মোল্যারকান্দিসহ কয়েকটি নদীতীরবর্তী এলাকাতেও ভাঙনের খবর পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পদ্মার ভাঙন ঠেকাতে জাজিরায় প্রায় ১ হাজার ২০২ কোটি টাকা ব্যয়ে বড় ধরনের নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ চলছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় প্রায় ১০ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার নদীতীর সুরক্ষায় তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গত বছরের ভয়াবহ ভাঙনের পর নদীপাড়ের মানুষের কাছে এই প্রকল্প আশার আলো হয়ে উঠেছিল। কিন্তু প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে ভাঙন দেখা দেওয়ায় সেই আশার সঙ্গে যোগ হয়েছে উদ্বেগ।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, প্রকল্পের একটি অংশের নকশা পরিবর্তন এবং প্রায় দুই কিলোমিটার অংশের অনুমোদন পেতে সময় লাগায় কাজ নির্ধারিত সময়ে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। ওই প্রায় দুই কিলোমিটার অংশের কাজের জন্য প্রায় ২৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। আগামী বছরের জুনের মধ্যে এ অংশের কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছরের ভয়াবহ ভাঙনের পর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো দ্রুত সুরক্ষিত করার প্রত্যাশা থাকলেও বর্ষার আগেই সব কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। ফলে পানি ও স্রোত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পের অসম্পূর্ণ অংশের আশপাশে নতুন করে ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মিলটন হোসেন বলেন, ভাঙনকবলিত এলাকার বিষয়ে তারা অবগত আছেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী ভাঙনরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যদিও নদীর তীরের মানুষের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি তীর রক্ষা প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি বর্তমানে যেসব এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে, সেখানে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগসহ কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে হবে।
তাদের আশঙ্কা, দ্রুত ভাঙন নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পানি ও স্রোত আরও বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাজিরার আরও বহু পরিবারকে হারাতে হতে পারে তাদের বসতভিটা। আর পদ্মার পাড়ে দাঁড়িয়ে সেই আশঙ্কাই যেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে- আজ যে বাড়ি নিরাপদ, কাল সেটিই হয়তো নদীর বুকের আরেকটি স্মৃতি।
প্রতিনিধি/এএম




