মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

যেখানে থাকার কথা ১০০ পরিবার, সেখানে পড়ে আছে পরিত্যক্ত ঘরের সারি

মো. আল-আমিন, শরীয়তপুর
প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫১ পিএম

শেয়ার করুন:

যেখানে থাকার কথা ১০০ পরিবার, সেখানে পড়ে আছে পরিত্যক্ত ঘরের সারি

মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই—ভূমিহীন মানুষের কাছে এর চেয়ে বড় স্বপ্ন আর কী হতে পারে! নিজের নামে একটি ঘর, সামনে ছোট্ট উঠান, পাশে আপনজনের বসতি—এমন স্বপ্ন নিয়েই একদিন পদ্মার চরে গড়ে উঠেছিল ১০০ ঘরের একটি আশ্রয়ণ প্রকল্প।

উদ্দেশ্য ছিল ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের জীবনে একটু স্বস্তি এনে দেওয়া। সরকারি অর্থে নির্মিত এসব ঘর হওয়ার কথা ছিল অসহায় মানুষের নিরাপদ ঠিকানা। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই আবাসনেই এখন দেখা যায় ভিন্ন চিত্র—ঘর আছে, মানুষ নেই; অবকাঠামো আছে, নেই যথাযথ ব্যবহার ও দেখভাল।

শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার চরআত্রা ইউনিয়নের খাসবাজারে ২০২০-২১ অর্থবছরে নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর বর্তমান চিত্র যেন সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।

প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচ একর খাস জমির ওপর নির্মাণ করা হয় ১০০টি আধাপাকা ঘর। প্রতিটি ঘরে রয়েছে দুটি কক্ষ, বারান্দা ও টয়লেট। দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ। নিরাপদ পানির জন্য বসানো হয়েছিল গভীর নলকূপ। ব্যতিক্রমী নকশায় ইংরেজি ‘১০০’ সংখ্যার আদলে সাজানো হয়েছিল পুরো প্রকল্প।

কল্পনাটা ছিল সুন্দর—শত ভূমিহীন পরিবার পাবে একটি করে ঠিকানা। নতুন ঘরে উঠবে সংসার, শিশুরা পাবে নিরাপদ পরিবেশ, অসহায় মানুষগুলো ফিরে পাবে স্বাভাবিক জীবনের স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নের কতটা পূরণ হয়েছে?

শত ঘরে বাস মাত্র ১১ পরিবারের

বর্তমানে ১০০টি ঘরের এই প্রকল্পে বসবাস করছে মাত্র ১১টি পরিবার। এর মধ্যে প্রকৃত বরাদ্দপ্রাপ্ত পরিবার রয়েছে মাত্র তিনটি। অন্যরা বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষিকাজের সন্ধানে এসে সেখানে বসবাস করছেন।

ফলে যে ঘরগুলোতে থাকার কথা ছিল ভূমিহীন মানুষের পরিবার, সেগুলোর অধিকাংশই পড়ে আছে খালি। দীর্ঘদিন খালি পড়ে থাকায় একে একে হারিয়ে যাচ্ছে ঘরের বিভিন্ন অংশ।

e78f77ff-2049-4011-abb0-4388045e2248

কোথাও নেই দরজা-জানালা। কোথাও খুলে নেওয়া হয়েছে টিন। কোথাও কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বৈদ্যুতিক তার। ব্যবহারের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে গভীর নলকূপ। পরিত্যক্ত ঘরের ভেতরে-বাইরে জমেছে ময়লা-আবর্জনা। একসময় যে ঘরগুলো ছিল একটি পরিবারের স্বপ্নের ঠিকানা, আজ সেগুলোর অনেকগুলোই দাঁড়িয়ে আছে অবহেলার সাক্ষী হয়ে।

ঘর আছে, নেই সংসারের কোলাহল

একটি আশ্রয়ণ প্রকল্প শুধু ইট-টিনের কয়েকটি ঘরের সমষ্টি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন, নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ ও স্বপ্ন। বিশেষ করে ভূমিহীন মানুষের জন্য নির্মিত একটি ঘর মানে শুধু চার দেয়াল নয়—এটি একটি পরিবারের সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ।

আরও পড়ুন

নৌ অ্যাম্বুলেন্স অচল, জরুরি চিকিৎসাবঞ্চিত ৭০-৮০ হাজার চরবাসী

সরকারি অর্থে নির্মিত এসব ঘর জনগণের সম্পদ। অথচ ব্যবস্থাপনা ও তদারকির অভাবে এর বড় একটি অংশ এখন নষ্ট হওয়ার পথে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, যাদের জন্য এত অর্থ ব্যয় করে ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল, তারা যদি সেখানে বসবাসই না করেন, তাহলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য কীভাবে পূরণ হবে?

1f0b42ba-63f3-452c-bb75-283a1ef60c07

‘১০০’ যেন এখন কেবল একটি সংখ্যা

দূর থেকে দেখলে প্রকল্পটির বিশেষ নকশা চোখে পড়ে। ইংরেজি ‘১০০’ সংখ্যার আদলে তৈরি পুরো আবাসন। ‘১০০’—একসময় যা ছিল শত পরিবারের স্বপ্নের প্রতীক। আজ সেই ‘১০০’-এর অধিকাংশ ঘরই খালি।

নেই শিশুদের কোলাহল, নেই রান্নার ধোঁয়া, নেই সংসারের ব্যস্ততা। আছে কেবল সারি সারি ঘর। কোথাও ভাঙা দরজা, কোথাও খোলা জানালা, কোথাও ছেঁড়া বৈদ্যুতিক তার। নীরব পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকা ঘরগুলো যেন প্রশ্ন করছে—যাদের জন্য আমাদের তৈরি করা হয়েছিল, তারা কোথায়?

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পটি নির্মাণের পর থেকে নিয়মিত তদারকি ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে ঘরগুলো খালি পড়ে থাকায় ধীরে ধীরে বিভিন্ন সরঞ্জাম নষ্ট বা চুরি হয়ে গেছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য সামছুদ্দিন ব্যাপারী বলেন, প্রকল্পের অনেক ঘর দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে আছে। এ কারণে দরজা-জানালা, টিন ও বৈদ্যুতিক তারসহ বিভিন্ন জিনিস নষ্ট বা খুলে নেওয়া হয়েছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের তালিকা যাচাই করে দ্রুত তাদের ঘর বুঝিয়ে দেওয়া হবে। পাশাপাশি যেসব ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলো সংস্কার করে বসবাসের উপযোগী করা হবে।

d656beb1-57ee-49bb-a880-6ab10cdfe9e8

নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল কাইয়ুম খান বলেন, প্রকৃত সুবিধাভোগীদের পুনর্বাসন এবং আশ্রয়ণ প্রকল্পের অবকাঠামো রক্ষায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

প্রশাসনের এই আশ্বাসে নতুন করে আশার আলো দেখছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রত্যাশা, এবার যেন কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেই ভূমিহীন মানুষের ঘরে ফেরার ব্যবস্থা হয়।

কারণ, চার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই ঘরগুলো কোনো পরিত্যক্ত স্থাপনা হওয়ার জন্য তৈরি হয়নি। এগুলো তৈরি হয়েছিল মানুষের জন্য—যাদের হয়তো নিজের জমি নেই, মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, কিন্তু একটি নিরাপদ ঘরের স্বপ্ন আছে।

পদ্মার চরে দাঁড়িয়ে থাকা ১০০ ঘরের এই প্রকল্প তাই শুধু একটি সরকারি স্থাপনা নয়; এটি মানুষের স্বপ্নের সঙ্গে জড়িত একটি উদ্যোগ। যেখানে থাকার কথা ছিল শত পরিবার, সেখানে এখন কেবল পরিত্যক্ত ঘরের সারি। এই ঘরগুলো আবার মানুষের হাসি-আনন্দে ভরে উঠবে, নাকি সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যাবে অবহেলার গহ্বরে—এখন সেই প্রশ্নই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর