মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

৫০০ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারক চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছোট সোনামসজিদ

মো. ফারুক হোসেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০৮ পিএম

শেয়ার করুন:

৫০০ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারক চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছোট সোনামসজিদ
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছোট সোনামসজিদ

দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ বললেই চোখে ভেসে ওঠে বিশাল আমবাগানের দৃশ্য। তবে ‘আমের রাজধানী’ হিসেবে খ্যাত এই জেলাটি কেবল মিষ্টি আমের জন্যই নয়, বরং প্রাচীন ইতিহাস, সমৃদ্ধ প্রতœসম্পদ ও ঐতিহ্যের ধারক হিসেবেও সমান সুপরিচিত। 

চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঁচটি উপজেলার মধ্যে অন্যতম প্রাচীন স্থান শিবগঞ্জ, যেখানে ছড়িয়ে রয়েছে বহু ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন। এই শিবগঞ্জেই গর্বের সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৫০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহাসিক ‘ছোট সোনামসজিদ’। 

১৫টি গম্বুজের একসময়ে সোনালি আস্তরণের কারণে এটি ছোট সোনামসজিদ নামে পরিচিত। যা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহর থেকে ৩৮ কিলোমিটার দূরে শিবগঞ্জ উপজেলায় মসজিদটির অবস্থান। মসজিদটির সামনে রয়েছে বেশ কয়েকটি কবর। উঁচু মঞ্চের ওপর অবস্থিত বড় কবর দুটি কার তা জানা যায়নি। 

ধারণা করা হয়, কবর দুটির একটি ওয়ালী মোহম্মদের এবং অন্যটি তার স্ত্রীর। মতান্তরে এই দুটি কাল্পনিক কবর। বরং এতে মসজিদ প্রতিষ্ঠাতার গুপ্তধন রক্ষিত রয়েছে। এছাড়া অন্য কবরগুলো তৎকালীন মুসলিম যোদ্ধাদের। প্রাচীন গৌড়ে আরেকটি মসজিদ রয়েছে, যা বড় সোনামসজিদ নামে পরিচিত। এটি তৈরি করেছিলেন সুলতান নুসরত শাহ। বর্তমানে এটি ভারতের মালদহ জেলার মোহদিপুরে রয়েছে। 

ছোট সোনামসজিদে ১১টি দরজা বা প্রবেশপথ রয়েছে। উত্তর দিকের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় একটি কক্ষ রয়েছে। মসজিদের চারকোণে চারটি বুরুজ রয়েছে। এগুলোর ভূমি নকশা অষ্টকোণাকার। মসজিদের পূর্ব দেয়ালে পাঁচটি খিলানযুক্ত দরজা রয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে রয়েছে তিনটি করে দরজা। 

S

তবে উত্তর দেয়ালের পশ্চিমের দরজাটির জায়গায় রয়েছে সিঁড়ি। এই সিঁড়িটি উঠে গেছে মসজিদের অভ্যন্তরে উত্তর-পশ্চিম দিকে দোতলায় অবস্থিত একটি বিশেষ কামরায়। কামরাটি পাথরের স্তম্ভের ওপর অবস্থিত। এটি ছিল সুলতান বা শাসনকর্তার নিরাপদে নামাজ আদায়ের জন্য আলাদাভাবে তৈরি একটি কক্ষ। 

মসজিদের ছাদে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন ১৫টি গুম্বুজ। এই মসজিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বাইরের যে কোনো দিক থেকে দেখলে কেবল পাঁচটি গম্বুজ দেখা যায়, পেছনের গম্বুজগুলো দৃষ্টিগোচর হয় না। মসজিদের বাইরের দিকে সোনালি রঙের আস্তরণ ছিল, সূর্যের আলো পড়লে এই রং সোনার মতো ঝলমল করত। 

তবে জনশ্রুতি রয়েছে, গম্বুজগুলো সোনার পাতে মোড়ানো ছিল বলে এর নামকরণ করা হয় সোনামসজিদ। মসজিদের দেয়ালের গায়ে কালো পাথরের ওপর খচিত রয়েছে বিভিন্ন গাছপালা ও ফুলের কারুকার্যময় নকশা। মসজিদের ভেতরে মেহরাবের ওপর ছিল শ্বেত পাথরের দুটি উজ্জ্বল শিলাখ। সূর্যালোকে শ্বেতপাথর দুটি উজ্জ্বল বর্ণ ধারণ করায় আলোকিত হয়ে উঠতো পুরো মসজিদ ঘর। 

১৮৯৭ সালের এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে মসজিদটির একাংশ ও মেহরাব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে তা ইট দিয়ে মেরামত করা হয়। এ সময় মধ্যবর্তী মেহরাবের ওপর স্বতন্ত্র দুটি শ্বেত পাথরের উজ্জ্বল শিলা ও আরও কয়েক টুকরো মূল্যবান পাথর ইংরেজরা নিয়ে যায়। এমনকি পশ্চিম দেয়ালের কারুকার্যপূর্ণ দুষ্প্রাপ্য ও বহু মূল্যবান শিল্প নিদর্শনও স্থানান্তরিত হয়ে বিলেতে চলে যায়

মধ্যযুগে প্রাচীন বাংলার রাজধানী গৌড় নগরীর উপকণ্ঠে পিরোজপুর গ্রামে এই অপরূপ স্থাপত্যটি নির্মিত হয়েছিল। সুলতানি আমলের এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটিকে একসময় বলা হতো ‘গৌড়ের রতœ’। 

ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, মধ্যযুগের স্বাধীন বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের রাজত্বকালে (১৪৯৩-১৫১৯ খ্রিস্টাব্দ) ওয়ালী মুহাম্মদ নামে এক ব্যক্তি মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদের মধ্যভাগের প্রধান দরজার ওপর খোদাই করা প্রাচীন শিলালিপি থেকে এর নির্মাতার পরিচয় ও ইতিহাস নিশ্চিত হওয়া যায়।

S

 মসজিদটির নামকরণের পেছনে রয়েছে এক চমৎকার ইতিহাস। নির্মাণের সময় এর বাইরের দেয়ালে ছিল সোনালি রঙের একটি বিশেষ আস্তরণ। প্রখর সূর্যের আলো যখন দেয়ালে পড়ত, তখন পুরো মসজিদটি সোনার মতো ঝলমল করে উঠত। সূর্যের সেই সোনালি আলোয় ভাস্বর হওয়ার কারণেই সাধারণ মানুষের কাছে এটি ‘সোনা মসজিদ’ নামে পরিচিতি লাভ করে। তবে কালের পরিক্রমায় এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেই সোনালি আস্তরণ আজ আর নেই; তা ধারণ করেছে তামাটে রূপ।

ছোট সোনামসজিদের নির্মাণকৌশল সুলতানি আমলের অনন্য স্থাপত্যশিল্পের পরিচয় বহন করে। মূল কাঠামোটি তৈরি ইটের হলেও তার ওপর বসানো হয়েছে সুদৃঢ় ও অলংকৃত পাথরের স্তর। পাথরের খোদাই করা নকশা ও সুলতানি যুগের কারুকাজ দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আজও বিমোহিত করে।

ছোট সোনামসজিদ কেবল মধ্যযুগের ইতিহাসের নীরব সাক্ষীই নয়, এটি আধুনিক বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতেও অম্লান। মসজিদ প্রাঙ্গণের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে শান্তিময় পরিবেশে শুয়ে আছেন জাতির দুই বীর সন্তান। এখানে রয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর এবং ৭ নম্বর সেক্টরের বীর অধিনায়ক মেজর নাজমুল হকের সমাধি। প্রাচীন স্থাপত্যের সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামের এই অমর ইতিহাস যুক্ত হয়ে স্থানটিকে এনে দিয়েছে এক ভিন্নমাত্রার শ্রদ্ধা ও গাম্ভীর্য। 

কালের আবহে সোনালি আস্তরণ ফিকে হয়ে গেলেও ছোট সোনামসজিদের মর্যাদা ও ঐতিহ্য বিন্দুমাত্র কমেনি। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে বহু পর্যটক ও ইতিহাসপ্রেমী ছুটে আসেন প্রাচীন বাংলার এই অপূর্ব রতœ ও বীর শ্রেষ্ঠদের স্মৃতিচিহ্ন চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করতে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যকে জানতে হলে ছোট সোনামসজিদ পরিদর্শন এক অবিচ্ছেদ্য অভিজ্ঞতা।

এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর