সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

মরিয়মের মৃত্যু

শ্যামনগরে গাজী নজরুলের বিচার দাবিতে বিএনপির বিক্ষোভ, কুশপুতুলে আগুন

জেলা প্রতিনিধি, সাতক্ষীরা
প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৪৩ পিএম

শেয়ার করুন:

শ্যামনগরে গাজী নজরুলের বিচার দাবিতে বিএনপির বিক্ষোভ, কুশপুতুলে আগুন
সাতক্ষীরার শ্যামনগরে বিএনপির বিক্ষোভ। ছবি: ঢাকা মেইল

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত নেতা গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবিতে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে। এসময় গাজী নজরুলের কুশপুতুলে আগুন দেওয়া হয়।

সমাবেশ থেকে গাজী নজরুল ইসলামের সর্বোচ্চ শাস্তি ও ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলা বিএনপির কার্যালয়ের সামনে নেতাকর্মী ও স্থানীয় সাধারণ মানুষ জড়ো হন। পরে ‘সচেতন নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে সেখান থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি উপজেলার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে উপজেলা প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে শেষ হয়।

বিক্ষোভে স্থানীয় নাগরিক নেতা আসাদুজ্জামান মিটু, আবুল কালাম মোড়ল, রেজাউল ইসলাম, আসিসুর রহমান, নূরনগরের আবুল ইউসুফসহ বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনা কোনোভাবেই ধামাচাপা দেওয়া যাবে না। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। মামলায় যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তদন্তে তাদের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেন। তাদের দাবি, নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও পরবর্তী কর্মকাণ্ড নিয়ে স্থানীয় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় তারা গাজী নজরুল ইসলামের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।

মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর দিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করেছেন শ্যামনগরের বাসিন্দা মোহাম্মদ মঞ্জুর সরদার। 

দুপুরে তিনি সাংবাদিকদের কাছে ওই দিনের ঘটনার বর্ণনা দেন।

মঞ্জুর সরদার বলেন, ২০ সেপ্টেম্বর আদালতে যাওয়ার জন্য গাজী নজরুল ইসলাম তাকে ফোন করে ডেকে নেন। আদালতের কার্যক্রম শেষে বেলা ৩টার দিকে তারা ‘ন্যাম ভবনের’ ফ্ল্যাটে ফিরে যান। তার সঙ্গে আরও পাঁচ-ছয়জন ছিলেন। তারা গেস্ট রুমে খাওয়া-দাওয়া করেন। অন্যদিকে গাজী নজরুল ইসলাম তার দুই স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা কক্ষে খাবার খান বলে জানান তিনি।

মঞ্জুরের ভাষ্য, কিছুক্ষণ পর গাজী নজরুল ইসলাম দ্রুত এসে তাকে ভেতরে যেতে বলেন। তিনি গিয়ে দেখতে পান, একটি কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। দরজা খোলার চেষ্টা করেও তারা খুলতে পারেননি।

পরে কক্ষের পেছনের দিকে গিয়ে একটি জানালা খোলা দেখতে পান তারা। জানালার পর্দা সরিয়ে ভেতরে তাকালে মরিয়ম খাতুনকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা যায় বলে দাবি করেন মঞ্জুর।

তিনি বলেন, মরিয়মের গলায় এবং ফ্যানের সঙ্গে কাপড়জাতীয় কিছু প্যাঁচানো ছিল। কক্ষের ভেতরে একটি চেয়ার ও একটি প্লাস্টিকের টুল পড়ে থাকতে দেখেন তারা। তবে ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে, সে বিষয়ে তিনি কোনো নিশ্চিত মন্তব্য করেননি।

মঞ্জুর আরও বলেন, মরিয়মকে জীবিত না মৃত, তা নিশ্চিত হওয়ার পর তারা দরজা-জানালা না ভেঙে পুলিশ ও মরিয়মের পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে সংসদ ভবন এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশকে জানানো হয়। তাদের মাধ্যমে শেরেবাংলা নগর থানায় খবর দেওয়া হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে তাদের সরে যেতে বলে।

তবে প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা থেকে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করা যায় না। বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করার বিষয়।

মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ তার মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় ওবায়দুল্লাহকে বেশি দায়ী বলে মনে করেন। 

তিনি বলেন, ও আমার মেয়েকে ঘর থেকে বাইরে বের করছে, ও সবকিছু করছে।

মরিয়ম বিয়ের পর ওই ফ্ল্যাটে থাকতেন বলে জানান তার বাবা। 

তবে মেয়ের সঙ্গে বিয়ের পর কোনো ধরনের অভিযোগ বা সমস্যার কথা হয়েছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, মরিয়ম তার কাছে এ ধরনের কোনো অভিযোগ করেননি।

মরিয়মের কাছ থেকে পাওয়া কিছু চিঠির বিষয়ে মাসুম বিল্লাহ বলেন, পুলিশ তাকে সেগুলো দেখিয়েছে। তবে লেখাগুলো তার মেয়ের হাতের লেখা কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তার ভাষ্য, তিনি ব্যবসার কাজে বাইরে থাকতেন এবং মেয়ের হাতের লেখা ভালোভাবে চিনতেন না।

বিক্ষোভকারীরা পরে শ্যামনগর উপজেলা প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান নেন। সেখানে গাজী নজরুল ইসলামের কুশপুতুল দাহ করে বিক্ষোভ করেন তারা। এ সময় বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে সাতক্ষীরা-৪ আসনে উপ-নির্বাচনের দাবিও জানান বিক্ষোভকারীরা।

গাজী নজরুল ইসলামের বাড়ির পাশের বাসিন্দা ও সাবেক জামায়াত কর্মী শাহজাহান বলেন, ‘আমি আগে জামায়াতের কর্মী ছিলাম। যারা জামায়াতের ঘোষিত কর্মী ছিলেন বা এখনো আছেন, তাদের চোখ খোলার দরকার। মানুষের সামনে বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে।’

রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানার ‘ন্যাম ভবনের’ একটি ফ্ল্যাট থেকে গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

পরে মরিয়মের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম ও শ্যালক ওবায়দুল্লাহকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রীকে গ্রেফতার করেছে।

প্রতিনিধি/এলএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর