রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

সামরিক আদালতে চাকরিচ্যুত, তথ্য গোপন করে সরকারি স্কুলে শিক্ষক

জেলা প্রতিনিধি, নেত্রকোনা
প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৬ এএম

শেয়ার করুন:

সামরিক আদালতে চাকরিচ্যুত, তথ্য গোপন করে সরকারি স্কুলে শিক্ষক
শিক্ষক ওমর শরীফ

নেত্রকোনার মদন উপজেলার জাহাঙ্গীরপুর তহুরা আমিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের সহকারী শিক্ষক মো. ওমর শরীফ খানের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী থেকে সামরিক আদালতের মাধ্যমে চাকরিচ্যুত হওয়ার তথ্য গোপন করে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

চাকরিতে যোগদানের সময় তিনি সেনাবাহিনী থেকে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কারণে স্বেচ্ছায় ইস্তফা দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে পুলিশের বিশেষ শাখার (ডিএসবি) ভেরিফিকেশন প্রতিবেদন এবং সেনাবাহিনীর রেকর্ডস শাখার চিঠিতে চাকরি ছাড়ার কারণ হিসেবে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।

নথিপত্র অনুযায়ী, ওমর শরীফ খান ১৯৯৪ সালের ২৯ নভেম্বর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন। তার সৈনিক নম্বর ৪০২০২৯৩। ২০০৯ সালের ১৮ জানুয়ারি তার চাকরির অবসান হয়। পরে ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে তিনি জাহাঙ্গীরপুর তহুরা আমিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে যোগ দেন।

২০২৩ সালে পুলিশের বিশেষ শাখার করা ভেরিফিকেশন প্রতিবেদনে তার সেনাবাহিনীর চাকরি ছাড়ার বিষয়ে ভিন্ন তথ্য উঠে আসে। নেত্রকোনা পুলিশের বিশেষ শাখার পরিদর্শক মো. দিদারুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই প্রতিবেদনের স্মারক নম্বর ২৪৪৫/২৩।

ভেরিফিকেশন প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনাবাহিনীর রেকর্ডস শাখার তথ্য অনুযায়ী, সেনা নীতিমালা ভঙ্গ করে পার্বত্য এলাকা থেকে কাঠ ও ফার্নিচার নিজ বাড়িতে নেওয়ার কারণে ওমর শরীফ খানকে সামরিক আদালতের মাধ্যমে চাকরিচ্যুত করা হয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে নেত্রকোনা ডিএসবি থেকে রাজশাহী সেনানিবাসে চিঠি পাঠানো হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টাল রেকর্ডস, রাজশাহী সেনানিবাস থেকে ২০২৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, ৪০২০২৯৩ নম্বরের সৈনিক মো. ওমর শরীফ খান সেনা নীতিমালা ভঙ্গ করে পার্বত্য এলাকা থেকে কাঠ ও ফার্নিচার নিজ বাড়িতে নেওয়ার কারণে ২০০৯ সালের ১৮ জানুয়ারি সংক্ষিপ্ত সামরিক আদালতের মাধ্যমে চাকরিচ্যুত হন।

অন্যদিকে, বিদ্যালয়ে যোগদানের সময় তিনি সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় ইস্তফা দেওয়ার তথ্য দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে নিয়োগের সময় তথ্য গোপনের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে ২০২৩ সালে ফজলুল হক নামের এক স্থানীয় ব্যক্তি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেন।

অভিযোগের পর তৎকালীন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ওমর শরীফের চাকরিসংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই করেন। এতে অসংগতি পাওয়া যায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় ইস্তফার দাবি করলেও তিনি এ-সংক্রান্ত যথাযথ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। তার দাখিল করা একটি অব্যাহতিপত্র সাদা কাগজে ছিল; অথচ সেনাবাহিনীর অব্যাহতিপত্র নিজস্ব প্যাডে থাকার কথা বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

নথি অনুযায়ী, ওমর শরীফ খান সেনাবাহিনীতে প্রায় ১৪ বছর এক মাস ১৭ দিন কর্মরত ছিলেন। স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার দাবি এবং সংশ্লিষ্ট নথির তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি থাকায় এ বিষয়ে তার কাছে ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়েছিল।

অভিযোগকারী ফজলুল হক বলেন, ২০২৩ সালে বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত হওয়ার তথ্য গোপন করে তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষক ওমর শরীফ বলেন, সেনাবাহিনীতে থাকাকালীন সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বিনানুমতিতে কাঠ নিয়ে আসার জন্য সামরিক আদালতের বিচারে আমাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, এটা সত্য। এছাড়া শিক্ষা সনদসহ কাগজপত্রে কোনো ঝামেলা নেই। তথ্য গোপন ছাড়াই যথাযথ নিয়মেই চাকরি নিয়েছেন বলেও তিনি জানান।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুরুল আমিন বলেন, এই বিষয়টা কয়েকদিন আগে জেনেছি। শিক্ষক ওমর শরীফের নিয়োগের সময় আমি কোনো প্রকার দায়িত্বে ছিলাম না। তাই এ বিষয়ে কিছু বলতে পারছি না। তবে শিক্ষক ওমর শরীফের নিয়োগের কাগজপত্র দেখার পাশাপাশি তার সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানান তিনি।

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বিষয়টি অবহিত করলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ময়মনসিংহ অঞ্চলের উপপরিচালক নাসির উদ্দীন বলেন, আদালতে সাজাপ্রাপ্ত হলে ওই ব্যক্তি আর কোনো সরকারি স্কুলে চাকরি করার সুযোগ নেই। নিয়োগ যেহেতু মাউশি দেয়, সেক্ষেত্রে ওই নিয়োগটা কিভাবে হয়েছিল যাচাই করে দেখতে হবে।

প্রতিনিধি/টিবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর