রাত পেরিয়ে ভোর হতেই দিনাজপুরের দশমাইল কলার হাটে বাড়তে থাকে চাষি ও ব্যবসায়ীদের ভিড়। সারি সারি কলার কাঁদি নিয়ে হাটে আসেন বিভিন্ন এলাকার চাষিরা। পাইকারদের দর-কষাকষিতে জমে ওঠে কেনাবেচা। উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তম এই কলার হাট থেকে প্রতিদিন ট্রাকে করে কলা যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। তবে গত বছরের তুলনায় এবার কলার দাম কম হওয়ায় হতাশ চাষিরা।
দেশের অন্যতম খাদ্যশস্য উৎপাদনকারী জেলা দিনাজপুরে উৎপাদিত সাগর কলার খ্যাতি রয়েছে দেশজুড়ে। জেলার কৃষকেরা সাগর, সবরি, মালভোগ ও চিনি চম্পাসহ বিভিন্ন জাতের কলা চাষ করেন। চলতি বছর কলার আবাদ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহও বেড়েছে। এতে গতবারের তুলনায় দাম কমে যাওয়ায় অনেক চাষি লোকসানের মুখে পড়েছেন।
জেলার কাহারোল উপজেলার দশমাইল মোড়ে বসে উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তম এই কলার হাট। দিনাজপুরের ১৩ উপজেলাসহ ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও নীলফামারী জেলার চাষিরা এখানে কলা নিয়ে আসেন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররাও কলা কিনতে আসেন এই হাটে।

রাত থেকে ভোর পর্যন্ত ভ্যান, নসিমন, ইজিবাইক ও পিকআপে করে কলা নিয়ে হাটে আসেন চাষি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। কেনাবেচা শেষে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ট্রাকে কলা বোঝাই করে পাঠানো হয়। সকাল আটটার মধ্যে হাটের কেনাবেচা শেষ হয়ে যায়। পরে এসব কলা ট্রাকে করে ঢাকার বাদামতলী, যাত্রাবাড়ী, তেজগাঁও, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলা শহরে পৌঁছে যায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, দশমাইল কলার হাটজুড়ে সারি সারি কলার কাঁদি সাজানো। ভোর থেকেই বিভিন্ন যানবাহনে করে কলা নিয়ে আসছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। পাইকারদের সঙ্গে দর-কষাকষির পর অনেক ক্ষেত্রেই ভ্যানের ওপর থেকেই কলা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। কলা বাছাই, পরিবহন ও ট্রাকে ওঠানোর কাজে প্রতিদিন কয়েক শ শ্রমিক যুক্ত থাকেন। ফলে এই হাটকে ঘিরে তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগও।
কলা চাষি আশরাফুল বলেন, ‘যে কলা গত বছর ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি, সেই কলা এবার ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর দাম কমে গেছে। কলা বিক্রি করে এবার লোকসান হয়েছে।’

আরেক চাষি সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘গতবারের তুলনায় এবার কলার আবাদ বেশি হয়েছে। অনেক চাষি কলা আবাদ করেছেন। বাজারে কলা বেশি ওঠার কারণে দাম কমে গেছে।’
ঢাকা থেকে আসা কলা ব্যবসায়ী তালুকদার হোসেন বলেন, ‘ভালো মানের কলার দাম তুলনামূলক বেশি। আমি প্রতিদিন এই হাট থেকে তিন থেকে চার ট্রাক কলা কিনে ঢাকায় পাঠাচ্ছি। তবে ঢাকায় কলার চাহিদা কম হওয়ায় বিক্রিও কম হচ্ছে। এ কারণে দশমাইলের হাটেও কলার দাম কমে গেছে।’
ফেনীর কলা ব্যবসায়ী মো. জালাল উদ্দীন নিয়মিত এই হাট থেকে পাইকারি কলা কেনেন। তিনি বলেন, ‘এক মাস আগে কলার দাম আরও বেশি ছিল। এখন দশমাইল কলার হাটে কলার জোগান বেশি হওয়ায় আগের তুলনায় দাম কিছুটা কমেছে।’
হাটের ইজারাদার মিজানুর রহমান জানান, মৌসুমে এই হাটে প্রতিদিন এক কোটি টাকারও বেশি কলা বিক্রি হয়। প্রতিদিন গড়ে ২০টি ট্রাকে কলা বোঝাই করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হয়। এখান থেকে সারা দেশে কলা সরবরাহ করা হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি খরিপ-১ ও রবি মৌসুমে জেলায় ১ হাজার ২৫৯ হেক্টর জমিতে কলার আবাদ হয়েছে। দশমাইলের কলার হাটে চার মাসে প্রায় ২০০ কোটি টাকার কলা কেনাবেচা হবে।
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘দশমাইলের কলার হাট থেকে প্রতিদিন অনেক গাড়ি বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে। গত বছর চাষিরা কলার দাম ভালো পেয়েছিলেন। কিন্তু চলতি বছর কলার দাম কিছুটা কম। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কলার দামও বাড়বে।’
প্রতিনিধি/এসএস




