বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

ময়মনসিংহ মেডিকেলে শয্যার চেয়ে রোগী চার গুণ, বারান্দা–মেঝেতে চিকিৎসা

জেলা প্রতিনিধি, ময়মনসিংহ
প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৮ পিএম

শেয়ার করুন:

ময়মনসিংহ মেডিকেলে শয্যার চেয়ে রোগী চার গুণ, বারান্দা–মেঝেতে চিকিৎসা

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। এক হাজার শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে চার হাজারের বেশি রোগী ভর্তি থাকছেন। ফলে শয্যা না পেয়ে বিভিন্ন ওয়ার্ডের বারান্দা, করিডোর ও মেঝেতে রোগীদের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। হাসপাতালে ৩৫০টি শূন্য রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে।

গত সোমবার হাসপাতালের নতুন ভবনের লিফটের বাইরের অংশে আগুন লাগার পর রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হুড়োহুড়িতে কয়েকজনের মৃত্যুর তথ্য নিয়ে প্রশ্ন ও আলোচনা চলছে। এ ঘটনার পর হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সমালোচনা হচ্ছে।

তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, এক হাজার শয্যার বিপরীতে কয়েক গুণ বেশি রোগী নিয়ে তাদের চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে। সীমিত জনবল ও অবকাঠামোর কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। 

সরেজমিন হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, হাসপাতালের নতুন ভবনের তৃতীয় তলার করিডোরে প্লাস্টিকের মাদুরে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন কয়েকজন রোগী। সেখানে নিউরোসার্জারি, ইউরোলজি এবং বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা অবস্থান করছিলেন।

রোগীর চাপের চিত্র

আটতলা ভবনের ষষ্ঠ তলায় শিশু ওয়ার্ড। ৬০ শয্যার এই ওয়ার্ডে গতকাল দুপুরে ভর্তি ছিল ৩৫০ জন রোগী। ওয়ার্ডের বারান্দা, মেঝে ও লিফটের সামনের জায়গা রোগী ও স্বজনদের ভিড়ে ঠাসা।

ত্রিশালের চকরামপুরের সেলিনা আক্তার বুধবার সকালে তাঁর এক বছর বয়সী মেয়ে আফরাকে হাসপাতালে ভর্তি করান। মেঝেতে পাতা প্লাস্টিকের মাদুরে ঘুমিয়ে ছিল শিশুটি। পাশ দিয়ে কোনোমতে চলাচল করছিলেন রোগী ও স্বজনেরা। সেলিনা আক্তার বলেন, ‘জ্বর, ঠান্ডা-কাশি লইয়া মেয়েরে ভর্তি করাইছি। এইখানে পা ফেলারও জায়গা নাই। কিন্তু আমরা এইখান থাইকা কই যাইবাম?’

চিকিৎসার কাজে নিয়োজিত একজন নার্সের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘রোগী বেশি থাকায় অনেক চাপ সামলাতে হয়। মানুষ দ্রুত সেবা পেতে চায়; কিন্তু আমরা যে অতিরিক্ত চাপ সামলাই, সেটা দেখে না।’

হাসপাতালে রোগীর সবচেয়ে বেশি চাপ মেডিসিন বিভাগে। পুরোনো ভবনে ১৭০ শয্যার এই বিভাগে বুধবার দুপুরে ভর্তি ছিলেন ৯৮৮ জন রোগী। অর্থাৎ অনুমোদিত শয্যার প্রায় ছয় গুণ রোগী সেখানে ভর্তি ছিলেন। সার্জারি বিভাগে ১৫০ শয্যার বিপরীতে বুধবার রোগী ভর্তি ছিলেন ৪৮৭ জন। অন্যান্য বিভাগেও কয়েক গুণ বেশি রোগী ভর্তি ছিলেন।

ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলা ছাড়াও টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম ও গাজীপুর জেলার রোগীরা এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ১০ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাত দিনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ হাজার ৬৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ১২ সেপ্টেম্বর সর্বোচ্চ ৪ হাজার ২৯৭ জন এবং ১৬ সেপ্টেম্বর সর্বনিম্ন ৩ হাজার ৮১৯ জন রোগী ভর্তি হন।

হাসপাতাল প্রশাসন জানিয়েছে, এক হাজার শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন চার গুণ রোগী ভর্তি থাকে। প্রত্যেক রোগীর সঙ্গে অন্তত দুজন করে স্বজন থাকায় প্রায় ১২ হাজার লোকের চাপ সামলাতে হয়।

৩৫০ পদ শূন্য

হাসপাতালের জনবলকাঠামোর তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অনুমোদিত পদ আছে ২ হাজার ২৮৬টি। এর মধ্যে ৩৫০টি শূন্য। সবচেয়ে বেশি সংকট চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী পদে। এ শ্রেণির অনুমোদিত ৪৬৪টি পদের বিপরীতে শূন্য আছে ২২১টি। তৃতীয় শ্রেণির ১৯৪টি পদের মধ্যে শূন্য ৬৭টি। ৪৬৬ চিকিৎসকের মধ্যে ৪০টি পদ শূন্য আছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের শুরুর দিকে চালু হওয়া সিটি স্ক্যান মেশিনটি গত মে মাসের শুরুর দিকে বিকল হয়ে যায়। আগে এটি দিয়ে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০টি পরীক্ষা করা হতো। এখন রোগীদের বাইরে গিয়ে সিটি স্ক্যান করাতে হচ্ছে।

অগ্নিকাণ্ডের পর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এবং ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি এম ইকবাল হোসেইন বুধবার সকাল ১১ টার দিকে হাসপাতাল পরিদর্শনে এসেছিলেন। হাসপাতালে চার গুণ রোগীর চাপ এবং বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকা প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এটার সমাধান এক দিনে হবে না। ভবিষ্যতে কী হবে, সেটি নিয়ে তাঁরা কথা বলছেন। এমন অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে কী পরিকল্পনা করা দরকার, তা ঠিক করতে প্রকৌশলীদের বলা হয়েছে। 

প্রতিনিধি/ এজে

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর