এক-দুই বছর নয়, জীবনের টানা সাতটি বছর কারাগারেই কেটেছে মোবাস্বেরা খানম রাথির। জন্মের পর থেকেই মায়ের সঙ্গে কারাগারে থাকা এই শিশুর কাছে পৃথিবীর পরিচিত সীমানা হয়ে উঠেছিল কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার। কারাগারে থাকা সবাই মিলে তার নাম রাখেন মোবাস্বেরা খানম রাথি। তবে মা কামরুন নাহার মণি তাকে ডাকেন ‘রোজা’ নামে।
ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিলেন কামরুন নাহার মণি। ২০১৯ সালের ১৫ এপ্রিল গ্রেফতারের সময় তিনি পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। ওই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর ফেনী আধুনিক সদর হাসপাতালে তার কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। নাম রাখা হয় মোবাস্বেরা খানম রাথি।
এরপর মায়ের সঙ্গেই কারাগারে বেড়ে উঠতে থাকে রাথি। মায়ের কোলে বসেই সে শুনেছে আদালতের রায়। ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর নিম্ন আদালত নুসরাত হত্যা মামলায় ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সময় এক মাস বয়সী রাথি ছিল মায়ের কোলে।
দীর্ঘ ছয় বছরের বেশি সময় মৃত্যুদণ্ডের সাজা নিয়ে কারাগারে থাকার পর অবশেষে হাইকোর্টের রায়ে মুক্তি পান কামরুন নাহার মণি। গত ২৪ আগস্ট বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ নুসরাত হত্যা মামলায় ১০ আসামিকে খালাস দেন। তাদের একজন কামরুন নাহার মণি। একই রায়ে দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল এবং চারজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

মুক্তির পর মেয়ে রাথির কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মণি। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে তিনি বলেন, ‘রোজাকে (রাথি) মোজা দিয়ে পুতুল বানিয়ে খেলতে দিতাম। বালিশকে স্কুল ব্যাগ বানিয়ে পড়ালেখা করাতাম। একজন মা হিসেবে আমার ও মেয়ের কষ্ট কেউ বুঝবে না। আমি তাকে নিয়ে আগামী জীবন থাকতে চাই।’
মণি আরও বলেন, ‘যারা আমাদের অন্যায়ভাবে নির্যাতন করে ফাঁসির আসামি করেছে, আমরা তাদের বিচার চাই।’
মণির ভাষ্য, কারাগারে থাকাকালে মেয়েকে নিয়ে নানা কল্পনার মধ্যেই সময় কাটিয়েছেন তিনি। কখনো মোজা দিয়ে পুতুল বানিয়ে দিয়েছেন, কখনো বালিশকে স্কুলব্যাগ বানিয়ে পড়িয়েছেন। কারাগারের সীমাবদ্ধতার মধ্যেই মেয়ের শৈশবকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেছেন।
মণির মা ও রাথির নানি নুর নাহার (৫৫) বলেন, পারিবারিক সম্পদ যা ছিল, মামলার খরচ চালাতে গিয়ে প্রায় শেষ হয়ে গেছে। এখন ঋণ করে মামলা চালাতে হচ্ছে। অর্থাভাবে নিয়মিত নাতনিকে দেখতেও যেতে পারেননি তিনি। সবশেষ গত ঈদুল ফিতরের পরদিন ২২ মার্চ নাতনিকে দেখতে গিয়েছিলেন।
নুর নাহার বলেন, ‘বাইরের পরিবেশটা কি নাতনি এখনো জানে না। ওখানে মা আছে। আরেকজন আসামিকে—তিনিও ফাঁসির আসামি—‘ছোট মা’ ডাকে। তারাই আদর-যত্ন করে। কিন্তু পোলাপানের মন কি আর মানে! জেলেও কষ্ট করছে, বাইরে এলেও কষ্ট করবে।’
তিনি বলেন, একমাত্র মেয়েই এখন মণির একমাত্র অবলম্বন। কিছুতেই মেয়েকে হারাতে চান না মণি।

বাবার কাছেও অপরিচিত রাথি
মায়ের সঙ্গে কারাগারে রাথির সাত বছরের শৈশব কাটলেও বাবার সান্নিধ্য খুব বেশি মেলেনি তার। মণির স্বামী রাশেদুল আলম খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আবেগঘন পোস্টে মেয়েকে কাছে না পাওয়ার দীর্ঘ কষ্টের কথা তুলে ধরেছেন।
রাশেদুল আলম লেখেন, ‘বাবা হয়েও বাবা হওয়ার স্বাদ পেলাম না আজও আমি!’ মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরার ইচ্ছা থাকলেও কঠোর নিরাপত্তার কারণে তা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।
তিনি লেখেন, ফেনী কারাগারে বিশেষ ব্যবস্থায় দেখা করার সুযোগ পেলেও মেয়েকে দূর থেকে দেখতে হতো। কখনো জানালার ফাঁক দিয়ে ছোট্ট পায়ের আঙুল ছুঁয়ে আদর করার চেষ্টা করেছেন। পরে কাশিমপুর কারাগারে নেওয়ার পর তাদের মাঝখানে ছিল নিরাপত্তার খাঁচা। দূরত্বের কারণে মেয়েটি তাকে ঠিকমতো চিনত না—এমন কষ্টের কথাও লেখেন তিনি।
রাশেদুল আলম আরও লেখেন, ‘এইভাবেই সময় অতিবাহিত হচ্ছিল। সারাদিন সবার সঙ্গে হাসিখুশি থেকে রাতভর যন্ত্রণায় ছটফট করা নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল।’
মেয়েকে নিয়ে নিজের উৎকণ্ঠার কথা জানিয়ে তিনি লেখেন, ‘এই সেপ্টেম্বরের ২১ তারিখ রাথির ৭ বছর পূর্ণ হবে। তাকে ছাড়া ১৪টা ঈদ, ৭টা জন্মদিন আমি পার করেছি। কী নিষ্ঠুর বাবা আমি। মেয়েটার জন্য কিছুই করতে পারিনি আমি।’
তিনি আরও লেখেন, ‘জানি না আমাকে চিনবে কি না রাথি, জানি না আমি কীভাবে তার সামনে দাঁড়াব। অস্থির অস্থির লাগছে আমার।’

যে মামলায় সাত বছর কারাগারে
২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার সাইক্লোন সেন্টারের ছাদে নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুন দেওয়া হয়। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তার বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় মামলা করেন।
মামলার বিচার শেষে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ১৬ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে আসামিরা হাইকোর্টে আপিল ও জেল আপিল করেন।
দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৬ সালের ২৪ আগস্ট হাইকোর্ট মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। চার আসামির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং কামরুন নাহার মণিসহ ১০ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।
হাইকোর্টের ওই রায়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ কারাবাসের অবসান ঘটে কামরুন নাহার মণির। আর মায়ের সঙ্গে কারাগারে বেড়ে ওঠা রাথির সামনে খুলে যায় কারাগারের বাইরের এক নতুন পৃথিবী।
প্রতিনিধি/এসএস




