মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

পদ্মার বুকে বৈঠার ছন্দ, রাজবাড়ীতে নৌকাবাইচ ঘিরে উৎসব

কাজী তানভীর মাহমুদ, রাজবাড়ী
প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০৫ পিএম

শেয়ার করুন:

পদ্মার বুকে বৈঠার ছন্দ, রাজবাড়ীতে নৌকাবাইচ ঘিরে উৎসব

নদীর শান্ত বুকে মাঝিদের ছন্দময় বৈঠার হাঁক—‘হেইও হেইও, মারো টান!’ থৈ থৈ জলরাশি চিরে তীব্র গতিতে এগিয়ে চলেছে বিশাল আকৃতির বাইচ নৌকা। নদীপারের হাজারো মানুষের করতালি আর আনন্দ-উল্লাসে মুখরিত পদ্মার পাড়। হারিয়ে যেতে বসা লোকজ সংস্কৃতিকে প্রাণবন্ত করে তুলতে রাজবাড়ীর কালুখালীতে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা ও গ্রামীণ মেলা।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া ইউনিয়নের মহেন্দ্রপুর খেয়াঘাটসংলগ্ন পদ্মা নদীতে জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাইচের উদ্বোধন করা হয়। আবহমান বাংলার এই উৎসব দেখতে সকাল থেকেই নদীতীরে ভিড় করেন বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ।

নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে মহেন্দ্রপুরের পদ্মার দুই পাড় রূপ নেয় মিলনমেলায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি আশপাশের জেলা থেকেও হাজারো দর্শনার্থী জড়ো হন। কেউ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে, আবার কেউ ছোট ডিঙি নৌকা ভাড়া করে মাঝনদীতে অবস্থান নিয়ে উপভোগ করেন প্রতিযোগিতা। শিশু-কিশোর ও নারীদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে।

64d32e86-0324-4ff0-b6f5-6887b61a6a5c

আয়োজকদের সূত্রে জানা গেছে, এবারের আসরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা আটটি সুসজ্জিত ও দ্রুতগামী নৌকা অংশ নিচ্ছে। প্রথম দিন চারটি বাইচ অনুষ্ঠিত হয়।

উদ্বোধনী বাইচে ‘উলাট একতা এক্সপ্রেস’কে হারিয়ে জয়ী হয় ‘নিউ শাপলা’। চর গোবিন্দপুরের নৌকাকে পরাজিত করে বিজয়ী হয় ‘জনতার সংগ্রাম’। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে ‘দুলদুল এক্সপ্রেস’কে পেছনে ফেলে জয় পায় ‘খয়রানা একতা চ্যালেঞ্জার’। প্রথম দিনের শেষ বাইচে কুষ্টিয়ার ‘লালন’ নৌকাকে হারিয়ে জয়ী হয় পাবনার সুজানগরের ‘রায় শিমুল একতা এক্সপ্রেস’।

নৌকাবাইচের পাশাপাশি নদীর তীরে বসেছে গ্রামীণ মেলা। মেলায় রয়েছে ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি-মণ্ডা, জিলাপি, কাঠের খেলনা এবং মাটি ও বাঁশের তৈরি নানা লোকজ সামগ্রী। বাইচ দেখার পাশাপাশি মেলা থেকে পছন্দের জিনিসপত্র কিনতে দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা যায়।

168892b6-fa27-4644-ad67-d73f6adad4c3

নারী দর্শনার্থী রহিমা বেগম (৪৫) বলেন, ‘গ্রামবাংলা থেকে নৌকাবাইচের মতো আনন্দগুলো প্রায় হারিয়েই যাচ্ছিল। অনেক দিন পর নদীর পাড়ে এসে এমন উৎসব দেখে মনটা ভরে গেল। পরিবারের সবাইকে নিয়ে সকাল সকাল চলে এসেছি। মেলা থেকে ছেলেমেয়েদের জন্য মাটির খেলনা আর জিলাপি কিনেছি। এই তিন দিন আমাদের জন্য ঈদের মতো আনন্দের।’

আরও পড়ুন

কুমিল্লায় ১৭৭ বছরের পুরোনো জানু মিয়া মসজিদ

কলেজ শিক্ষার্থী ফারজানা আক্তার রুনা (২২) বলেন, ‘বইয়ে আর টিভিতে নৌকাবাইচের কথা পড়েছি ও দেখেছি। কিন্তু সামনে থেকে মাঝিদের বৈঠার ছন্দ আর নৌকার তীব্র গতি দেখার অনুভূতি একেবারেই আলাদা। নতুন প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্যগুলো বাঁচিয়ে রাখতে এমন আয়োজন বারবার হওয়া দরকার।’

cbffa5f1-aefa-4c21-8501-9df0af6c4af6

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা আলহাজ আকরাম হোসেন (৬২) বলেন, ‘আমাদের যৌবনে প্রতি বছরই পদ্মায় এমন বাইচ হতো। সময়ের সঙ্গে তা কমতে শুরু করেছিল। আজকের মেলা আর বাইচ দেখে মনে হচ্ছে পুরোনো দিনগুলো আবার ফিরে এসেছে।’

চাকরিজীবী সুমন শেখ (২৮) বলেন, ‘আমি ঢাকায় থাকি। নৌকাবাইচের খবর শুনেই বন্ধুদের সঙ্গে গ্রামে ছুটে এসেছি। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষের একসঙ্গে চিৎকার আর করতালির মধ্যে যে আবেগ, তা অন্য কোনো খেলায় পাওয়া যায় না।’

d2f8840d-0ade-453f-b7f2-20b59a44342c

আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, নৌকাবাইচ কেবল খেলা বা প্রতিযোগিতা নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতির আত্মপরিচয়ের অংশ। যান্ত্রিকতার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা এই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিন দিনব্যাপী আয়োজনের বাকি দুই দিন মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ও বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) আরও কয়েকটি দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। আয়োজকদের প্রত্যাশা, সমাপনী দিনগুলোতে পদ্মার পাড়ে আরও বড় সাংস্কৃতিক উদ্দীপনা সৃষ্টি হবে।

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর