মাথার ওপর নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা, আর পায়ের নিচে মৃত্যুফাঁদ। দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে মানুষের উদাসীনতা। নীলফামারী জেলার একমাত্র ওভারব্রিজটি নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল দুর্ঘটনা কমানো, কিন্তু বাস্তবে সেই ওভারব্রিজ এখন প্রায় পরিত্যক্ত। প্রতিদিন শত শত মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্যস্ত মহাসড়ক পার হচ্ছেন, আর নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কোটি টাকার সেই অবকাঠামো। সরকারের কোটি টাকার এই অবকাঠামো কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে পথচারীদের অনীহা, অব্যবস্থাপনা এবং সচেতনতার অভাবে। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা।
উত্তরা ইপিজেড সংলগ্ন সৈয়দপুর-ডোমার মহাসড়ক নীলফামারী জেলার অন্যতম ব্যস্ত সড়ক। শিল্পাঞ্চল হওয়ায় সকাল ও সন্ধ্যায় কর্মীদের যাতায়াতে সড়কটি অত্যন্ত ব্যস্ত থাকে। এ পরিস্থিতিতে নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করতে গত সরকারের আমলে এখানে জেলার একমাত্র পথচারী ওভারব্রিজ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওভারব্রিজটি ব্যবহার না করে অধিকাংশ মানুষ সরাসরি মহাসড়ক পার হচ্ছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কেউ এটিকে নিছক উদাসীনতার ফল বলছেন, আবার কেউ মনে করছেন ওভারব্রিজটি সঠিক স্থানে নির্মাণ না হওয়ায় মানুষ এটি ব্যবহার করতে আগ্রহী নয়।
স্থানীয় বাসিন্দা আপন ইসলাম বলেন, উত্তরবঙ্গে এ ধরনের ওভারব্রিজ খুব কমই দেখা যায়। আমাদের উচিত এটি ব্যবহার করা। বিশেষ করে ইপিজেডে ছুটির সময় সবাই একসঙ্গে রাস্তা পার হতে গিয়ে ঝুঁকি তৈরি করে। এটি একটি ব্যস্ত মহাসড়ক, তাই জনসাধারণকে ওভারব্রিজ ব্যবহার করতে বাধ্য করার ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
আরেক বাসিন্দা মারজান ইসলাম বলেন, সরকার মানুষের নিরাপদ চলাচলের জন্য এত টাকা ব্যয় করে ওভারব্রিজ নির্মাণ করেছে। কিন্তু আমাদের অলসতার কারণে আমরা এটি ব্যবহার করছি না। পরে দুর্ঘটনা ঘটলে দায় তো আমাদেরই নিতে হবে।
অন্যদিকে, পরিবহন চালকদের অভিযোগ— পথচারীরা ওভারব্রিজ ব্যবহার না করে হঠাৎ করেই মহাসড়কে নেমে পড়ছেন, যা সড়ক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সিএনজি চালক রফিকুল ইসলাম বলেন, গাড়ি চলন্ত অবস্থায় হঠাৎ কেউ সামনে চলে এলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তখন গাড়ির ভেতরে থাকা যাত্রী এবং বাইরে থাকা পথচারী— দুই পক্ষকেই বাঁচানোর চেষ্টা করতে হয়। সরকার যখন নিরাপদ পারাপারের জন্য ওভারব্রিজ করেছে, তাহলে সেটি ব্যবহার না করার কোনো যুক্তি নেই।
বাসচালক হারেজ মিয়া বলেন, পথচারীরা যদি ওভারব্রিজ ব্যবহার করতেন, তাহলে আমাদের বারবার গাড়ি থামাতে হতো না। মানুষ রাস্তা পার হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকলে গাড়ি থামাতে হয়। এতে সময় নষ্ট হয়, নির্ধারিত সময়সূচিও ব্যাহত হয়।

এদিকে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ বলছে, ওভারব্রিজ ব্যবহার না হওয়ার অন্যতম কারণ সড়কের দুই পাশে যত্রতত্র যানবাহন পার্কিং এবং অব্যবস্থাপনা। বিষয়টি সমাধানে জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের সহযোগিতায় কাজ চলছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সুলতান মাহমুদ বলেন, উত্তরা ইপিজেডের সামনে সকাল ও সন্ধ্যায় যানজট ও বিশৃঙ্খলার অন্যতম কারণ হলো যত্রতত্র পার্কিং। জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের সহযোগিতায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কাজ চলছে। খুব শিগগিরই এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কারণ যাই হোক না কেন, নীলফামারীর একমাত্র ওভারব্রিজটি ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতা ছাড়া এই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়।
প্রতিনিধি/এফএ




