শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

ভরা মৌসুমেও পদ্মা-মেঘনায় কমেছে ইলিশের বিচরণ

আলআমিন ভূঁইয়া, চাঁদপুর
প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪১ এএম

শেয়ার করুন:

ভরা মৌসুমেও পদ্মা-মেঘনায় কমেছে ইলিশের বিচরণ

ইলিশের ভরা মৌসুম চলছে। স্থানীয় জেলেদের আহরিত ইলিশের পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চল ও চট্টগ্রাম থেকেও কিছু ইলিশ আসছে চাঁদপুর শহরের বড় স্টেশন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে। এতে কিছুটা বেড়েছে মাছঘাটের কর্মব্যস্ততা। বর্তমানে স্থানীয় ও আমদানি করা মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ মণ ইলিশ কেনাবেচা হচ্ছে।

গত বছরের তুলনায় এবার ইলিশের আমদানি খুব একটা কমেনি। বরং তুলনামূলক বড় সাইজের ইলিশ বেশি পাওয়া যাচ্ছে। তবে দাম আগের মতোই চড়া। নাব্যতা সংকট ও নদীতে চর জেগে ওঠায় পদ্মা-মেঘনার মিঠাপানিতে ইলিশের বিচরণ কমে যাওয়ার একাধিক কারণ জানিয়েছেন গবেষক।

সরেজমিন চাঁদপুরের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, সদর উপজেলার আনন্দ বাজার, বহরিয়া ও হরিণা ফেরিঘাট এলাকার জেলে, মৎস্য ব্যবসায়ী ও মৎস্যজীবী নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

আনন্দ বাজার এলাকার জেলে জামাল গাজী বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার ইলিশের আমদানি কমেনি। তবে ছোট সাইজের ইলিশ কম পাওয়া যাচ্ছে। বড় সাইজের ইলিশই বেশি মিলছে। তার ভাষ্য, গত পাঁচ থেকে সাত বছরের তুলনায় পদ্মা-মেঘনায় ইলিশের পরিমাণ কমেছে।

37811584-5f04-4646-9873-67a3b790ce86

লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের বহরিয়া জেলেপাড়ার প্রবীণ জেলে জামাল মিয়াজী বলেন, নদীতে জাটকা ও মা ইলিশের প্রজননের সময় কিছু মৌসুমি জেলে জাটকা আহরণ করেন। এতে ইলিশ বড় হওয়ার সুযোগ পায় না। পাশাপাশি নিষিদ্ধ ফাঁদের ব্যবহারও পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। এসব কারণে আগের তুলনায় ইলিশ কমে যাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

হানারচর ইউনিয়নের হরিণা ফেরিঘাটসংলগ্ন মাছঘাটের ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, নদীতে ইলিশ আছে। তবে গত বছরের তুলনায় দাম কমেনি। পদ্মা-মেঘনার টাটকা ইলিশের চাহিদা বেশি থাকায় জেলেরা ঘাটে মাছ নিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই বিক্রি হয়ে যায়। অনেক ক্রেতাই সরাসরি ঘাট থেকে ইলিশ কিনতে চান।

এই ঘাটের পাইকারি ইলিশ বিক্রেতা মোহাম্মদ ইব্রাহীম জানান, বরফ ছাড়া এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা দরে। ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম কেজিপ্রতি ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা। ছোট সাইজের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা।

b55aa8bc-a789-4f07-9fb8-b99bfe6b21db

কচুয়া থেকে হরিণা মাছঘাটে ইলিশ কিনতে আসা মোহসিন হোসাইন বলেন, তাজা ইলিশ কেনার জন্য তিনি এই ঘাটে এসেছেন। ছোট ও মাঝারি সাইজের ইলিশ মিলিয়ে ১০ হাজার টাকার মাছ কিনেছেন। বড় সাইজের ইলিশ বাজেটের সঙ্গে মিলিয়ে কেনা কঠিন। তবে এই ঘাটে ডাকে ইলিশ বিক্রি হওয়ায় ক্রেতারা তুলনামূলক ভালো মাছ বেছে নিতে পারেন।

আরও পড়ুন

আগাম ফুলকপির ক্ষেতে কৃষকের সোনালি স্বপ্ন

হাজীগঞ্জ শহর থেকে আসা ক্রেতা মাছুম তালুকদার বলেন, ইলিশের আমদানি থাকলেও দাম কমেনি। দরদামে মিললে তিনি মাছ কিনবেন। চাঁদপুরের ঘাটে তাজা ইলিশ পাওয়া যায় বলেই দূর-দূরান্ত থেকে অনেকে গাড়ি নিয়ে এখানে আসেন।

চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী শবে বরাত সরকার বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার ইলিশের আমদানি কমেওনি, বাড়েওনি। অনেকটা স্থিতিশীল রয়েছে। মাঝে মাঝে আমদানি বাড়লেও চাহিদার তুলনায় তা কম। চাঁদপুরের ইলিশ দেশজুড়ে ব্র্যান্ডিং হওয়ায় এখানকার মাছের ক্রেতাও বেশি।

2238eaf0-7f1a-42ce-9df9-e13a65db5d94

চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে মৎস্য বিভাগের সার্বিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে জাটকা রক্ষা ও মা ইলিশের প্রজনন নিশ্চিত করতে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চাঁদপুরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৩৫ হাজার ৪৭২ মেট্রিক টন। চলতি বছর এখন পর্যন্ত গড়ে ইলিশের আমদানি ঠিক আছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি হলে গত বছরের সঙ্গে উৎপাদনের প্রকৃত পার্থক্য জানা যাবে।

ইলিশ গবেষক (অব.) ড. আনিছুর রহমান বলেন, পদ্মা-মেঘনায় ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণ নির্ণয়ে কাজ চলছে। প্রাথমিকভাবে দেখা যাচ্ছে, জেলেরা ছোট সাইজের ইলিশ ধরতে কারেন্ট জালের মতো নিষিদ্ধ ফাঁদ ব্যবহার করছেন। একই সঙ্গে মেঘনার মোহনা ও নদীর তলদেশে পলি জমে বড় বড় চর ও বালুচর সৃষ্টি হচ্ছে। এতে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল ও মাইগ্রেশন রুট সংকুচিত ও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি বলেন, গভীর পানির মাছ হওয়ায় ইলিশ অগভীর ও চরপ্রবণ পথ এড়িয়ে চলতে বাধ্য হচ্ছে। এ ছাড়া নদীর তলদেশে পানি দূষণের কারণে ইলিশের খাদ্যসংকটও তৈরি হয়েছে।

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর