মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

সমবায়ের অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশ: ২ সাংবাদিকের নামে মামলা

জেলা প্রতিনিধি, লালমনিরহাট 
প্রকাশিত: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৪ পিএম

শেয়ার করুন:

সমবায়ের অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশে ২ সাংবাদিকের নামে মামলা
মামলার শিকার দুই সাংবাদিক

সমবায় সমিতির আড়ালে অবৈধ ঋণদান, চড়া সুদে কিস্তি আদায়, গ্রাহকদের আমানতের অর্থ আটকে রাখা এবং সঞ্চয়ের বিপরীতে নিম্নমানের পণ্য দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে লালমনিরহাটে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়েছে। 

মামলাটি বর্তমানে নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) লালমনিরহাটকে দায়িত্ব দিয়েছেন আদালত।

এদিকে সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরকে স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর চাপ ও আইনের অপব্যবহার হিসেবে উল্লেখ করে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে লালমনিরহাটের সাংবাদিক সমাজ। একইসঙ্গে মামলাটি প্রত্যাহার এবং সমবায় সমিতির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

জানা গেছে, গত ১৩ এপ্রিল দৈনিক কালবেলায় ‘গ্রাহকের ১২ কোটি টাকা নিয়ে উধাও দুই সমিতি’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে ‘তিস্তা সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি’ ও ‘তিস্তা ইন্টারন্যাশনাল’-এর স্বত্বাধিকারী এম. এ. হাশেম ওরফে বাবুলের বিরুদ্ধে সাধারণ গ্রাহকদের আমানতের অর্থ আটকে রাখা, ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত চড়া সুদে টাকা লেনদেন এবং সঞ্চয়ের টাকার বিপরীতে নিম্নমানের পণ্য দেওয়ার অভিযোগ তুলে ধরা হয়।

একই বিষয়ে দেশের প্রথম সারির আরও কয়েকটি সংবাদমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদনে গ্রাহকদের অভিযোগ, সমিতির কার্যক্রম এবং আর্থিক অনিয়মের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।

সংবাদ প্রকাশের পর ‘তিস্তা সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সভাপতি এবং বর্তমানে নাম পরিবর্তন করে ‘তিস্তা সমবায় বাজার’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. এ. হাশেম রংপুর সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন।

মামলায় দৈনিক কালবেলার লালমনিরহাট প্রতিনিধি এস. কে সাহেদ এবং ‘নয়া দিগন্তের’ (ডিজিটাল) প্রতিনিধি মো. জুবাইর আহমেদ খানকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মানহানিকর তথ্য প্রচারের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ২ জুলাই অভিযোগটি আমলে নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য সিআইডি লালমনিরহাটকে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন আদালত।

মামলার বিষয়ে অভিযুক্ত সাংবাদিক দৈনিক কালবেলার লালমনিরহাট প্রতিনিধি এস. কে সাহেদ বলেন, সংবাদ প্রকাশের পেছনে কোনো ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য ছিল না। সমবায় সমিতির নামে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগই সংবাদে তুলে ধরা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো উদ্দেশ্যে নয়, বরং সমবায় সমিতির নামে সাধারণ মানুষের রক্ত পানি করা টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সত্য ঘটনাই তুলে ধরেছিলাম। সরেজমিনে গ্রাহকদের ক্ষোভ ও তাদের অনিশ্চয়তার কথা সংবাদে উপস্থাপিত হয়েছে। আমাদের কণ্ঠরোধ করতে ও অপকর্ম আড়াল করতেই চতুরতার আশ্রয় নিয়ে এই মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে।’

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলার প্রতিবাদ জানিয়ে প্রেসক্লাব লালমনিরহাটের আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন স্বপন ও সদস্যসচিব তৌহিদুল ইসলাম লিটন বলেন, বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যভিত্তিক সংবাদ প্রকাশের পর সেটি খণ্ডন বা প্রতিবাদ না করে সরাসরি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা মুক্ত ও স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর আঘাত।

তারা বলেন, ‘আমরা এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে তা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি।’

সাংবাদিক নেতা শরিফুল ইসলাম রতন বলেন, অনিয়মের অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিরা নিজেদের কর্মকাণ্ড আড়াল করার চেষ্টা করছেন। কালবেলা ও নয়া দিগন্তের (ডিজিটাল) প্রতিনিধির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি প্রতিশোধমূলক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তার ভাষায়, ‘সিআইডির নিরপেক্ষ তদন্তে সত্য বেরিয়ে আসবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। অবিলম্বে এই হয়রানি বন্ধ না হলে কঠোর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।’

স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, সমবায়ের নিয়ম-নীতির আড়ালে যদি কোনো ব্যক্তি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করে থাকেন, তাহলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত সত্য বের করা জরুরি। তাদের প্রশ্ন- আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত না করে সংবাদ প্রকাশকারী সাংবাদিকদেরই যদি আইনি হয়রানির মুখে পড়তে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের অভিযোগ প্রকাশ করবে কে?

তাদের দাবি, সমবায় সমিতির বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়ম, গ্রাহকদের আমানতের অর্থ আটকে রাখার অভিযোগ এবং চড়া সুদে ঋণ দেওয়ার বিষয়গুলো প্রশাসনিক ও আইনগতভাবে তদন্ত করা হোক। পাশাপাশি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটিরও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত সমবায় সমিতির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. এ. হাশেম ওরফে বাবুলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে মামলাটি তদন্তাধীন থাকায় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি সিআইডি লালমনিরহাটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

প্রতিনিধি/এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর