মাছ চাষ, দোকান নির্মাণ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার কথা বলে ‘লাখপতি অফার’ চালু করেছিল একটি কথিত এনজিও। ১০ হাজার টাকা জমা দিলে এক লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মাত্র পাঁচ দিনে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে সংস্থাটির কর্মকর্তারা লাপাত্তা হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত অরঙ্গি পাইলট প্রজেক্ট’ লেখা বড় একটি বিলবোর্ড টাঙিয়ে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের কলতাপাড়ায় কার্যালয় নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছিল কথিত সংস্থাটি। তবে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় জানিয়েছে, এ নামে কোনো সংগঠন তাদের নিবন্ধিত নয়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাকিস্তানের অরঙ্গি পাইলট প্রজেক্টের নাম ও লোগো ব্যবহার করে কথিত সংস্থাটির কর্মকর্তারা মানুষের মধ্যে ভিজিটিং কার্ড বিতরণ করেন। সংস্থাটির শাখা ব্যবস্থাপক বুলু আহমেদের দেওয়া মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল করেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। কথিত অডিট কর্মকর্তা ঈশিতা আক্তারের মুঠোফোন নম্বরের সংযোগও বিচ্ছিন্ন পাওয়া গেছে।
বাসার মালিক আলী আজম বলেন, ‘গত ২৯ আগস্ট সংস্থাটির তিন-চারজন আমার কাছ থেকে ঘর ভাড়া নেন। ৬ সেপ্টেম্বর তাদের সঙ্গে ঘর ভাড়ার চুক্তিপত্র হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শুক্রবার থেকেই তারা লাপাত্তা। পরে বিষয়টি জানিয়ে গৌরীপুর থানায় অভিযোগ দিয়েছি।’
গৌরীপুর উপজেলার বায়ড়াউড়া গ্রামের আবুল হাসেম বলেন, তার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছিল। রোববার সকালে তাকে এক লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার কথা ছিল। একইভাবে লাকি আক্তারের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা এবং পপি আক্তারের কাছ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয় বলে জানান তিনি।
তারাকান্দা উপজেলার বিসকা গ্রামের সবুজ মিয়া বলেন, তার স্ত্রী নাজমা আক্তারকে এক লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার কথা বলে ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। একই গ্রামের আল আমিনকে দুই লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার কথা বলে নেওয়া হয়েছে ২০ হাজার টাকা। এ ছাড়া রোকিয়া আক্তার ও মারুফা আক্তারের কাছ থেকে সদস্য হওয়ার কথা বলে ১ হাজার ২০০ টাকা করে নেওয়া হয়।
ওই গ্রামের হাফসা আক্তার, আফজাল হোসেন ও নুর আলীর কাছ থেকেও ‘লাখপতি অফার’-এর কথা বলে ১০ হাজার টাকা করে সঞ্চয় নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। হাফসা আক্তার বলেন, ‘রোববার সকালে ঋণ দেওয়ার কথা ছিল। এ টাকা নিজের ছাগল বিক্রি করে জমা দিয়েছি। অফিসে গিয়ে দেখি, এখন তালাবদ্ধ।’
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এভাবে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে পাঁচ দিনে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে কথিত সংস্থাটির কর্মকর্তারা উধাও হয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ‘অরঙ্গি পাইলট প্রজেক্ট’ পাকিস্তানের করাচির অরঙ্গি টাউনে পরিচালিত একটি কমিউনিটিভিত্তিক বস্তি উন্নয়ন ও স্যানিটেশন কর্মসূচি। ১৯৮০ সালে সমাজবিজ্ঞানী ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. আখতার হামিদ খান এ প্রকল্পের সূচনা করেন। সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় নিম্ন আয়ের মানুষের অংশগ্রহণ ও অর্থায়নে স্যানিটেশন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মডেল হিসেবে প্রকল্পটি পরিচিত। ওই প্রকল্পের নাম ও লোগো ব্যবহার করেই কথিত চক্রটি প্রতারণা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাহফুজ ইবনে আইয়ুব বলেন, ‘এ নামে কোনো সংগঠন সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধিত নয়। যারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন, তারা ইউএনও বা থানায় অভিযোগ দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
গৌরীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুর রহমান বলেন, প্রতারণার শিকার মানুষ ক্ষুব্ধ। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিনিধি/এসএস




