স্ত্রীর সঙ্গে অভিমান করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরতে ঘুরতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এসে পড়েছিলেন জামরুল মিয়া (২৯)। পরে ছিনতাইকারীদের হামলায় আহত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
অসুস্থতার কারণে নিজের নাম-পরিচয় ঠিকভাবে জানাতে না পারায় হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে অজ্ঞাতনামা হিসেবে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। এ অবস্থায় তার পরিচয় শনাক্ত ও পরিবারের সন্ধানে চেষ্টা চালানো হয়। একপর্যায়ে শনাক্ত হয় তার পরিচয় এবং যোগাযোগ করা সম্ভব হয় স্বজনদের সঙ্গে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের’ উদ্যোগে জামরুল মিয়াকে তার চাচা কাসেম মিয়ার কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ সময় তার আরেক চাচা আব্দুর রাশেদ উপস্থিত ছিলেন। পরে স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে নেত্রকোনার নিজ বাড়ির উদ্দেশে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাড়েন জামরুল মিয়া।
জামরুলের চাচা কাসেম মিয়া ও আব্দুর রাসেদ সোমবার দুপুর ১২টার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এসে পৌঁছান। পরে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের’ উদ্যোগে তাদের সিএনজিচালিত অটোরিকশা দিয়ে আশুগঞ্জ পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি ভৈরব থেকে নেত্রকোনায় যাওয়ার যাতায়াত খরচ, প্রয়োজনীয় ওষুধসহ অন্যান্য সহযোগিতাও করা হয়।
জামরুল মিয়ার বাড়ি ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোনা জেলার সদর উপজেলার ৮ নম্বর দক্ষিণ বিশিউড়া ইউনিয়নের বিয়ারালী গ্রামে। তার বাবার নাম মৃত এরশাদ মিয়া। স্ত্রীর নাম লিপি আক্তার। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) পারিবারিক কলহের জেরে স্ত্রীর সঙ্গে অভিমান করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন জামরুল। এর আগে তিনি প্রায় চার বছর ধরে কসবা এলাকায় কৃষিকাজ করতেন। বাড়ি থেকে বের হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাউতলী এলাকায় আসেন জামরুল। পরে রাতে মোটরসাইকেলে করে কসবার দিকে যাওয়ার পথে কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের সৈয়দাবাদ এলাকায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। এ সময় ছিনতাইকারীরা তার মোবাইল ফোন ও নগদ প্রায় ৫ হাজার টাকা নিয়ে যায়। তাকে মারধর করে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে রেখে যায়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে অসুস্থ অবস্থায় প্রথমে কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। সেখানে তাকে অজ্ঞাতনামা হিসেবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাত সাড়ে ১০টার দিকে কসবা থানা পুলিশ তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে নিয়ে আসে। এরপর থেকে তিনি হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে চিকিৎসাধীন ছিলেন। হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সদের চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের’ তত্ত্বাবধানে তার প্রয়োজনীয় দেখভাল করা হয়। হাসপাতাল পুলিশ বক্সের সদস্যরাও তাকে সহযোগিতা করেন। একই সঙ্গে তার পরিচয় শনাক্ত করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে শুরু হয় নানা ধরনের প্রচেষ্টা।
হাসপাতাল পুলিশ বক্সে দায়িত্বে থাকা কনস্টেবল মঞ্জুর আলম ফারাবী বলেন, জামরুল যখন হাসপাতালে আসেন, তখন তিনি অজ্ঞাতনামা ছিলেন এবং নিজের পরিচয়ও ঠিকভাবে বলতে পারছিলেন না। আমরা তার চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় দেখভালের পাশাপাশি পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করি। পরে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়। পরিবারের কাছে তাকে নিরাপদে ফিরিয়ে দিতে পেরে আমরা আনন্দিত।
‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের’ প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান মো. আজহার উদ্দিন বলেন, একজন মানুষ যখন অসুস্থ অবস্থায় নিজের পরিচয় বলতে পারেন না, তখন তার পাশে দাঁড়ানো আমাদের মানবিক দায়িত্ব। জামরুল মিয়ার পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরিবারের সদস্যরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আসার পর তাকে প্রয়োজনীয় ওষুধ, যাতায়াতের ব্যবস্থা ও অন্যান্য সহযোগিতা দিয়ে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। একজন মানুষকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারাটা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও তৃপ্তির বিষয়।
জামরুল মিয়াকে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের পর তার চাচা কাসেম মিয়া বলেন, আমরা অনেক চিন্তায় ছিলাম। জামরুলের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকায় কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে- কিছুই জানতাম না। ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’ ও হাসপাতালের পুলিশ সদস্যদের সহযোগিতায় তাকে ফিরে পেয়েছি। তাদের প্রতি আমরা আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। তারা সহযোগিতা না করলে হয়তো তাকে খুঁজে পাওয়া আরও কঠিন হতো।
কসবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলী মোহাম্মদ রাশেদ বলেন, জামরুল মিয়াকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। তার পরিচয় শনাক্ত ও পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে পুলিশ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেছে। বর্তমানে তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
প্রতিনিধি/এলএ




