বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে প্রতিদিন বদলাচ্ছে খোদাবক্সপুরের মানুষের ঠিকানা

জেলা প্রতিনিধি, ময়মনসিংহ
প্রকাশিত: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৮ পিএম

শেয়ার করুন:

ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে প্রতিদিন বদলাচ্ছে খোদাবক্সপুরের মানুষের ঠিকানা

ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ভাঙনামারী ইউনিয়নের খোদাবক্সপুরে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে প্রতিদিনই বদলে যাচ্ছে মানুষের ঠিকানা। কোথাও বাড়ির উঠান শেষ হয়ে গেছে নদীর কিনারায়, কোথাও ঘরের পাশের মাটি ফেটে নিচের দিকে নেমে গেছে। আবার কোথাও বসতভিটার সঙ্গে নদীর দূরত্ব মুছে গেছে। নদীর স্রোতের শব্দে আতঙ্কে রাত কাটছে বাসিন্দাদের।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) ওই গ্রামে গিয়ে কথা হয় সত্তরোর্ধ্ব আবদুল মান্নানের সঙ্গে। জীবনে চারবার বসতভিটা হারিয়েছেন তিনি। একসময় তার ২০ একর জমি ছিল। সেই জমিতে ধান ও অন্যান্য ফসল ফলিয়ে সংসার চালিয়েছেন। সন্তানদের জন্য কিছু রেখে যাওয়ার স্বপ্নও ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্নের প্রায় পুরোটাই এখন ব্রহ্মপুত্রের পেটে। শেষ আশ্রয় হিসেবে মেজো ছেলের সঙ্গে যে বাড়িতে থাকছেন, সেটিও এখন ভাঙনের কিনারায়। এরই মধ্যে ভেঙে পড়েছে দুটি ঘর।

স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে খোদাবক্সপুরে প্রায় ১৫০ পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। চলতি বছরই আরও ১৫ থেকে ২০টি পরিবার বাড়িঘর সরিয়ে নিয়েছে। তাদের দাবি, অব্যাহত ভাঙনে গ্রামের প্রায় অর্ধেক নদে চলে গেছে। এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে বহু বাড়িঘর ও কৃষিজমি।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কখন নদ আরও কাছে চলে আসে, কখন পায়ের নিচের মাটি সরে যায়—এ নিয়ে সব সময় আতঙ্কে থাকতে হয়। বিশেষ করে রাতে ভাঙনের শব্দ শুনলেই অনেক পরিবার ঘর ছেড়ে নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়।

ইতোমধ্যে কেউ কেউ নদীর ওপারে জেগে ওঠা চরে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে নতুন করে ঘর তুলেছেন। তবে চর যে স্থায়ী ঠিকানা নয়, সেটিও জানেন তারা। ফলে একবার ভিটা হারানোর পর আবারও নদীভাঙনের ঝুঁকি নিয়েই বসতি গড়তে হচ্ছে তাদের।

আবদুল মান্নানের মতো একই শঙ্কায় দিন কাটছে মিলিক জানের। সাত বছর আগে তার স্বামী মারা গেছেন। পাঁচ মাস আগে মারা গেছে এক ছেলে। স্বামী রেখে গিয়েছিলেন ২২ কাঠা জমি। সেই জমিও এখন ব্রহ্মপুত্রের ভেতর।

মিলিক জান বলেন, ‘আমার সুখের সংসার আছিল। স্বামী জমিজমা থুইয়া গেছিন। কত ধান হইত, কত ফসল হইত! গোলায় ধান উঠত, বাড়িতে মানুষের আনাগোনা আছিল। জমিন নদ নিয়া গেছে। বাড়ি আছিল, ভাঙছে। গাছপালা আছিল, হেইগুলাও নদের পেটে। অহন সেই জমিন খুঁজলে নদের পানি ছাড়া আর কিছুই দেহা যায় না।’

এই কথায় ফুটে ওঠে নদভাঙনে শুধু জমি বা বসতভিটা হারানোর নয়, একটি পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি ও স্মৃতি হারানোর বাস্তবতা।

ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন শুধু খোদাবক্সপুরেই সীমাবদ্ধ নেই। নদটির তীরবর্তী গৌরীপুরের পাশের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মরিচারচর এবং ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরদড়ি-কুষ্টিয়া, শ্রীকলদীসহ কয়েকটি এলাকাতেও ভাঙন দেখা দিয়েছে।

কোথাও নদে চলে যাচ্ছে কৃষিজমি, কোথাও বসতভিটা পড়েছে ঝুঁকিতে। এতে নদতীরবর্তী এসব এলাকার মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ভাঙনামারী ইউনিয়নের বয়োবৃদ্ধ বাসিন্দা ইদ্রিস আলী বলেন, বর্ষায় ব্রহ্মপুত্রের পানি বাড়লেই ভাঙন তীব্র হয়। এরই মধ্যে গ্রামের অনেক জমি নদে চলে গেছে। আরও অনেক জমি ও বাড়িঘর ঝুঁকিতে রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জরুরি ভিত্তিতে কিছু এলাকায় প্রতিরক্ষামূলক কাজ করা হলেও দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর তীররক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছরই নতুন করে ভাঙনের শিকার হচ্ছেন তারা। তাদের দাবি, ভাঙন শুরু হওয়ার পর জিও ব্যাগ বা জিও টিউব ফেলে সাময়িক প্রতিরোধের পাশাপাশি নদীর গতিপথ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বিবেচনায় নিয়ে স্থায়ী তীর সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

ব্রহ্মপুত্র সুরক্ষা কমিটির সমন্বয়ক আবুল কালাম আল আজাদ বলেন, ‘ব্রহ্মপুত্রের গতিপথ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলেও নদের তীরে বসবাসরত মানুষের নিরাপদ বসতি, কার্যকর তীররক্ষা ও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। এ জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম হাসনাইন মাহমুদ জানান, প্রায় ২৭০ মিটার এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে জরুরি প্রতিরক্ষা কাজ চলছে।

আরও পড়ুন

গুরুদাসপুরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, হুমকিতে শতাধিক বিঘা জমি

তিনি জানান, চরদড়ি-কুষ্টিয়ায় প্রায় ৬০ মিটার অংশে জিও টিউব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। চর শ্রীকলদীতে ফেলা হচ্ছে জিও ব্যাগ। খোদাবক্সপুর ও মরিচারচরেও একই ধরনের জরুরি প্রতিরক্ষা কাজ চলছে।

ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোতে স্থায়ী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে ডিপিপি প্রণয়নের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। এ জন্য একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। খোদাবক্সপুরে ব্লক দিয়ে স্থায়ী তীর সংরক্ষণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

নদভাঙনের পাশাপাশি অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে স্থানীয়দের। তাদের অভিযোগ, নদ থেকে বালু উত্তোলনের কারণে কোথাও কোথাও ভাঙনের তীব্রতা বাড়ছে।

ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান জানান, গত তিন মাসে দুটি বড় অভিযানে ৪৭টি ড্রেজার ধ্বংস করা হয়েছে। এরপরও রাত ও ভোরে অবৈধভাবে বালু তোলার চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পাশাপাশি মামলা করা হচ্ছে।

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর