বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

নান্দাইলে শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত, কার্যালয়ে শতাধিক শিক্ষক

জেলা প্রতিনিধি, ময়মনসিংহ
প্রকাশিত: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪৫ এএম

শেয়ার করুন:

নান্দাইলে শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত, কার্যালয়ে শতাধিক শিক্ষক

ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন্নেছার বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের দিন বিদ্যালয়ে ক্লাস রেখে শতাধিক শিক্ষককে উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ে ডেকে আনার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, শিক্ষা কর্মকর্তার পক্ষে কথা বলার জন্য তার পছন্দের ও অনুসারী শিক্ষকদের সেখানে ডাকা হয়।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টা থেকে নান্দাইল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের দোতলায় এ তদন্ত শুরু হয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-১) মজিব আলম তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, তদন্ত কর্মকর্তার কক্ষের ভেতরে ও বাইরে অনেক শিক্ষক অবস্থান করছেন। তদন্ত চলাকালে অভিযুক্ত শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন্নেছাকেও ওই কক্ষে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। এ নিয়ে অভিযোগকারী পক্ষের সাক্ষীদের বক্তব্য গ্রহণের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন শিক্ষক।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষক বলেন, অভিযুক্ত কর্মকর্তার সামনেই তাদের লিখিত অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য দিতে হয়েছে। এতে অনেকে স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলতে পারেননি। কেউ কেউ তদন্ত কর্মকর্তার সামনে সাদা কাগজে লিখিত বক্তব্য দেন, যা অভিযুক্ত কর্মকর্তার উপস্থিতিতেই নেওয়া হয়েছে।

সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ের সামনে ও ভেতরে শতাধিক শিক্ষককে অবস্থান করতে দেখা যায়। কয়েকজন শিক্ষক জানান, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ফোন করে তাদের সেখানে যেতে বলা হয়েছিল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন প্রধান শিক্ষক বলেন, শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চলমান তদন্তে তার পক্ষে কথা বলার জন্য তাদের ডাকা হয়েছিল। তবে বিদ্যালয়ে ক্লাস চলাকালে শিক্ষকদের উপজেলা সদরে আসার কারণে পাঠদান ব্যাহত হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

তবে একজন প্রধান শিক্ষক বলেন, মাস শেষ হওয়ায় তারা বেতন তুলতে উপজেলা সদরে এসেছিলেন। একই সঙ্গে শিক্ষা কার্যালয়েও গিয়েছিলেন।

নান্দাইল উপজেলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির আহ্বায়ক আমিনুল ইসলাম আনজু বলেন, ‘এভাবে শিক্ষকদের দলবেঁধে আসা কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। যতদূর জানতে পেরেছি, নিজের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্তকে প্রভাবিত ও আড়াল করতেই শিক্ষা কর্মকর্তা তার পছন্দের শিক্ষকদের ডেকে এনেছেন।’

শিক্ষক নেতা জাকির আহম্মেদ তুহিন বলেন, শিক্ষা কর্মকর্তা তাকে একটু আসার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। তাই তিনি এসেছিলেন। তবে পরিস্থিতি বুঝতে পেরে পরে চলে যান।

নান্দাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিলি আক্তার, চন্ডীপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পারভিন আক্তার ও সৈয়দগাঁও চন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাহিদা ইয়াসমিন বলেন, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় থেকে ফোন করে তাদের যেতে বলা হয়েছিল। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চলমান তদন্তে তার পক্ষে সাফাই দেওয়ার জন্য তাদের ডাকা হয়েছে। বিষয়টি বিব্রতকর মনে হওয়ায় তারা দ্রুত বিদ্যালয়ে ফিরে যান।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন্নেছা বলেন, তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগের তদন্ত হচ্ছে—এ কথা শুনে অনেকেই সেখানে আসতে পারেন। তবে স্কুল চলাকালে শিক্ষকেরা তার নির্দেশে এসেছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক না।’

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, স্কুল ফাঁকি দিয়ে কোনো শিক্ষকের অকারণে উপজেলা সদরে আসার সুযোগ নেই। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

বিচারকের সিল-স্বাক্ষর জাল করে এফিডেভিট, বাবা-ছেলের বিরুদ্ধে মামলা

তদন্ত কর্মকর্তা মজিব আলম বলেন, ‘সব তথ্য ও প্রমাণ খতিয়ে দেখে অধিদফতরে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। আমার তদন্তে যাদের প্রয়োজন, তাদের সঙ্গেই কথা বলেছি। অন্যরা কেন এসেছেন, তা আমার জানা নেই।’

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর থেকে গত ২৫ আগস্ট জারি করা এক অফিস বিজ্ঞপ্তি সূত্রে জানা যায়, নান্দাইল উপজেলার নগর কচুরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজিজুন্নাহার শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন্নেছার বিরুদ্ধে মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন।

অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বরাদ্দ করা মেরামত ও সংস্কার খাতের অর্থ আত্মসাৎ, উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ের মেরামত ও আসবাবপত্র সরবরাহের বরাদ্দ থেকে অর্থ লোপাট এবং বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বরাদ্দের টাকা আত্মসাৎ।

এ ছাড়া উপজেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের সঙ্গে যোগসাজশ করে অবৈধভাবে বিল উত্তোলন, বদলি নীতিমালা লঙ্ঘন করে শিক্ষক বদলি ও নিয়মবহির্ভূতভাবে শিক্ষকদের সাময়িক সংযুক্তি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বিধিবহির্ভূতভাবে শিক্ষা কর্মকর্তার কক্ষে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) লাগানোর অভিযোগসহ আরও কয়েকটি অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে অধিদফতরের পক্ষ থেকে তদন্ত করা হচ্ছে।

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর