সীমান্তবর্তী জেলা চুয়াডাঙ্গায় ফেনসিডিল, গাঁজা ও ইয়াবার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে ট্যাপেন্টাডলসহ নেশাজাতীয় ট্যাবলেট এবং বুপ্রেনরফাইন ইনজেকশনের উপস্থিতি বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে এসব মাদক উদ্ধারের ঘটনাও ঘটছে। এতে জেলার মাদক পরিস্থিতিতে নতুন প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে ৬ বিজিবির কয়েক বছরের অভিযানের তথ্যেও মাদকের ধরন বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত ১১ হাজারের বেশি নেশাজাতীয় ট্যাবলেট ও ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এর পরের এক বছরে ২৫ হাজার ৪৮৫টি ট্যাপেন্টাডল ও নেশাজাতীয় ট্যাবলেট উদ্ধার করেছে বিজিবি। একই সময়ে ১০ হাজার ৬১৭ বোতল ফেনসিডিল ও ২৩৮ কেজির বেশি গাঁজাও উদ্ধার করা হয়।
অবশ্য মাদক উদ্ধারের পরিমাণ অভিযান, নজরদারি ও পাচারের কৌশলের ওপর নির্ভর করে। তারপরও বিপুলসংখ্যক ট্যাপেন্টাডলসহ নেশাজাতীয় ট্যাবলেট উদ্ধারের ঘটনা মাদকের ধরন পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন অভিযানেও ট্যাপেন্টাডল উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে। কোথাও শত শত, আবার কোথাও হাজার হাজার পিস ট্যাপেন্টাডল উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি বুপ্রেনরফাইন ইনজেকশনও উদ্ধার হয়েছে। ফলে প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি ওষুধজাত নেশাদ্রব্য নিয়ন্ত্রণও এখন নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দামুড়হুদা, দর্শনা ও জীবননগরের সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে মাদক পাচারের ঝুঁকি দীর্ঘদিনের। এসব এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবা ও ট্যাপেন্টাডলসহ বিভিন্ন মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। তবে মাদকের বিস্তার এখন আর সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই। জেলার অভ্যন্তরেও বিভিন্ন সময়ে মাদক উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে চুয়াডাঙ্গা শহরের একটি কুরিয়ার সার্ভিসের সামনে থেকে ৫ হাজার ৭০০ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এ ধরনের ঘটনায় সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের পর বিভিন্ন পরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে মাদক জেলার ভেতরে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি সামনে আসে। ফলে সীমান্তের পাশাপাশি জেলার অভ্যন্তরের সরবরাহব্যবস্থার ওপরও নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
মাদকের ধরন পরিবর্তনের পাশাপাশি কিশোর ও তরুণদের মাদকে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সম্প্রতি জীবননগরে এক মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক সভায় জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদেরও মাদক বহনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। উচ্চমাধ্যমিক ও অনার্সপড়ুয়া তরুণ-তরুণীদের মধ্যে মাদকাসক্তি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

চুয়াডাঙ্গা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের প্রসিকিউটর আকুব্বার আলী বলেন, মাদক প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান চলছে। কারবারি ও সেবনকারী—উভয়ের বিরুদ্ধেই মামলা করা হচ্ছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের পাশাপাশি সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রুহুল কবির খান বলেন, মাদক কারবারিদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে দ্রুত শাস্তি এবং কারবারিদের আত্মসমর্পণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। মাদকমুক্ত জেলা গড়তে পুলিশ কাজ করছে।

চুয়াডাঙ্গা জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মারুফ সরোয়ার বাবু বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে সামারি ট্রায়াল কার্যকর ভূমিকা রাখছে। দ্রুত বিচার ও শাস্তির ফলে অপরাধীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা-৬ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান বলেন, সীমান্ত নিরাপত্তা ও মাদক-চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবি সতর্ক রয়েছে। অবৈধ কার্যক্রম দমনে গোয়েন্দা নজরদারি, নিয়মিত টহল ও বিশেষ অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
প্রতিনিধি/এসএস




