সকাল হলেই বাড়ির আঙিনায় শুরু হয় সেলাই মেশিনের খটখট শব্দ। কেউ কাপড় কাটছেন, কেউ সেলাইয়ে ব্যস্ত। কারও হাতে সূচ-সুতা। নিপুণ হাতে কাপড়ের ওপর ফুটে উঠছে ফুল, পাখি, লতাপাতা ও নানা নকশা। একসময় যে হাতে সংসারের অভাব-অনটনের হিসাব কষতে হতো, সেই হাতেই এখন তৈরি হচ্ছে রঙিন পোশাক। সুঁই-সুতার ফোঁড়ে ফোঁড়ে যেন নিজেদের ভাগ্য বদলের গল্প লিখছেন এক মা ও তার মেয়ে।
তারা গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার নলডাঙ্গা ইউনিয়নের প্রতাপ ছয়ঘরি এলাকার মোছা. লতিফা বেগম ও তার মেয়ে তাসলিমা আক্তার তানজিনা। তাদের হাত ধরে গড়ে উঠেছে ছোট্ট একটি এমব্রয়ডারি পল্লী। সেখানে কাজের সুযোগ পেয়েছেন এলাকার প্রায় ২০০ নারী।
সংসারে স্বচ্ছলতা ছিল না। বড় কোনো পুঁজি ছিল না, ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতাও ছিল না। তবে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছা ছিল লতিফা ও তাসলিমার। সেই ইচ্ছা থেকেই প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা পোশাকে নকশার কাজ শুরু করেন।

সাদুল্লাপুর উপজেলা পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের প্রশিক্ষণ নিয়ে ২০২২ সালে অর্ডারের ভিত্তিতে কাজ শুরু করেন মা-মেয়ে। প্রথম দিকে কাজের পরিমাণ কম ছিল। পরিচিতজন ও স্থানীয় ক্রেতাদের কাছ থেকেই অর্ডার আসত। হাতের কাজ ও মান ভালো হওয়ায় ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে অর্ডার।
তবে অর্ডার বাড়ার সঙ্গে দেখা দেয় পুঁজি সংকট। প্রয়োজনীয় কাপড়, সুতা, নকশার উপকরণ ও সরঞ্জাম কেনার মতো অর্থ ছিল না তাদের হাতে। তখন তাদের পাশে দাঁড়ায় বিআরডিবির ক্ষুদ্র ঋণ।

ঋণের টাকায় প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও সরঞ্জাম কেনেন তারা। ছোট পরিসরের কাজ ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। বাড়তে থাকে অর্ডার ও কাজের পরিমাণ। তাদের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকেন এলাকার অন্য নারীরাও।
বর্তমানে প্রতাপ ছয়ঘরির এই এমব্রয়ডারি পল্লীতে কাজ করছেন প্রায় ২০০ নারী। কেউ পোশাক তৈরির কাজ করেন, কেউ নকশিকাজ, আবার কেউ সেলাই ও পোশাকে শেষ ছোঁয়া দেওয়ার কাজ করেন।
তাদের তৈরি শাড়ি, থ্রি-পিস, সালোয়ার-কামিজসহ বিভিন্ন ধরনের নকশিকাজের পোশাক এখন শুধু স্থানীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই। অর্ডারের মাধ্যমে এসব পোশাক যাচ্ছে বিভিন্ন জেলাতেও।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এলাকার অনেক নারী আগে ঘরের কাজেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। এখন তারা বাড়ির কাজ ও পড়াশোনার পাশাপাশি এমব্রয়ডারির কাজ করে আয় করছেন। এতে সংসারে তাদের অবদান যেমন বেড়েছে, তেমনি তারা পেয়েছেন অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা ও আত্মবিশ্বাস।
এই এমব্রয়ডারি পল্লীর কর্মী মোছা. হাসি খাতুন ও আদুরি আক্তার কলেজে পড়াশোনা করেন। পড়াশোনার ফাঁকে তাসলিমার কাছে নকশার কাজ শিখে তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন তারা। এতে মাসে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় হচ্ছে তাদের। নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে সেই টাকা কাজে লাগাতে পেরে আনন্দিত তারা।
লতিফা বেগমের কাছে এই পরিবর্তন শুধু ব্যবসা বড় হওয়ার গল্প নয়; এটি পরিবারের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। একসময় সামান্য প্রয়োজন মেটাতেও যেখানে হিসাব করতে হতো, এখন নিজের কাজের ওপর ভরসা করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

লতিফা বেগম বলেন, কারখানার সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা লাভ থাকে। এখন তাদের লক্ষ্য এমব্রয়ডারি পল্লীকে আরও বড় করা এবং এলাকার আরও বেশি নারীকে কাজের সুযোগ করে দেওয়া।
তবে এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রয়োজন বাড়তি বিনিয়োগ। তিনি বলেন, কর্মীদের নিয়ে কাজের জন্য একটি শেড, এমব্রয়ডারি মেশিনসহ উন্নত মানের সরঞ্জাম, কাঁচামাল সংগ্রহ এবং অর্ডার বাড়াতে তাদের প্রায় ৫ লাখ টাকার বেশি অতিরিক্ত মূলধন প্রয়োজন। সরকারি বা বেসরকারি সহযোগিতা পেলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তিনি।
উদ্যোক্তা তাসলিমা আক্তার তানজিনার চোখে এখন আরও বড় স্বপ্ন। স্থানীয় এই উদ্যোগকে একটি পরিচিত ব্র্যান্ডে পরিণত করতে চান তিনি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাদের তৈরি পোশাক পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি আরও বেশি নারীকে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত করে স্বাবলম্বী করতে চান।

তাসলিমা বলেন, সামনে তাদের আরও বড় হওয়ার স্বপ্ন রয়েছে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে কাজের পরিধি বাড়াতে চান তারা।
সাদুল্লাপুর উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা আবু সালেহ মো. সালাউদ্দিন বলেন, গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে এমব্রয়ডারি ও হস্তশিল্পের মতো উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। লতিফা ও তার মেয়েকে ঋণ দেওয়াসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে। তাদের জন্য একটি শেড স্থাপনেরও চেষ্টা করা হবে।
প্রতাপ ছয়ঘরির এই এমব্রয়ডারি পল্লী তাই এখন শুধু পোশাকে নকশা তোলার জায়গা নয়। সুঁই-সুতার ফোঁড়ে ফোঁড়ে এখানে তৈরি হচ্ছে নারীর স্বাবলম্বিতার গল্প, বদলে যাচ্ছে পরিবারগুলোর জীবন। একটি ছোট উদ্যোগ কীভাবে ধীরে ধীরে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে, তারই উদাহরণ হয়ে উঠেছে এই পল্লী।
প্রতিনিধি/এসএস




