নড়াইলের কালিয়া উপজেলার বড়দিয়া বাজার নদীভাঙনের হুমকিতে পড়েছে। মধুমতী ও নবগঙ্গা নদীর ভাঙনে বাজারের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে বাজারের প্রায় ৪০০ ব্যবসায়ী ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। এরই মধ্যে কয়েকটি দোকান নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় মালামাল ও দোকানের অবকাঠামো সরিয়ে নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
বড়দিয়া বাজার ব্রিটিশ আমল থেকে এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। একসময় নদীপথ ছিল এ বাজারের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান যোগাযোগমাধ্যম। আশপাশের প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকার পাশাপাশি তিন জেলার মানুষ এখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। বাজারে বিভিন্ন ব্যাংক, এনজিও ও কালিয়া উপজেলার বড় খাদ্যগুদাম রয়েছে। চাল, ডাল, সার, রড-সিমেন্ট, হার্ডওয়্যারসহ বিভিন্ন পণ্য পাইকারি ও খুচরা বিক্রি হয়। কৃষিপণ্য ও পান বেচাকেনার জন্যও বাজারটি পরিচিত।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সকালে নদীভাঙন থেকে বাজার, বসতবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রক্ষার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। উপজেলার কোটাকোল ইউনিয়নের বড়দিয়া বাজারসংলগ্ন খেয়াঘাট এলাকায় মধুমতী নদীর তীরে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। এতে শতাধিক নারী-পুরুষ অংশ নেন।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, এক দিনের ব্যবধানে নদীর তীরের ১০ থেকে ১৫টি বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদীতীরের বাসিন্দাদের বেশির ভাগই নিম্নআয়ের মানুষ। ঘরবাড়ি হারিয়ে নতুন করে ঘর নির্মাণের সামর্থ্য তাদের নেই। নদীভাঙনে বড়দিয়া বাজারও দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। একসময় এখানে বন্দর ছিল। বর্তমানে বাজারের যে অংশটুকু টিকে আছে, সেটিও হুমকির মুখে।
বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, ইতোমধ্যে কয়েকটি দোকান নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আরও কয়েকটি দোকান যেকোনো সময় নদীতে ধসে পড়তে পারে। এ কারণে অনেক ব্যবসায়ী মালামাল ও দোকানের অবকাঠামো সরিয়ে নিচ্ছেন। তাদের দাবি, স্থায়ী বাঁধ থাকলে এ ক্ষতি এড়ানো যেত।

মানববন্ধনে ষাটোর্ধ্ব নিহাত বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমি একজন সর্বহারা। অনেক কষ্ট করে ঘরটুকু করেছিলাম। নদী সেটাও নিয়ে গেল। এখন আমার থাকারও কোনো জায়গা নেই। বাড়ির জমি সব চলে গেছে। অল্প একটু আছে, সেটুকুও থাকবে না। পানি টান দিলে সব চলে যাবে। আমার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।”
খাশিয়াল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বি. এম. বরকত উল্লাহ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মধুমতী ও নবগঙ্গা নদীর সংযোগস্থলে ভাঙনের কারণে বড়দিয়া মৌজার বড় অংশ বিলীন হয়ে গেছে। বাজারের অধিকাংশ দোকান ভেঙে গেছে, বন্দরও এখন আর নেই। নতুন করে ভাঙন শুরু হওয়ায় বাজারটি হুমকির মুখে পড়েছে।

তিনি বলেন, নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে বাজারের ব্যবসায়ীদের নিয়ে এ বিষয়ে কথা বলা হয়েছে। ভাঙন মোকাবিলায় নদীতীরে জিও ব্যাগ ফেলার জন্য একটি প্রকল্প জমা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। পরে ব্লক ফেলে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণেরও উদ্যোগ নেওয়া হবে। পানি কমতে শুরু করলে ভাঙন আরও বাড়তে পারে। তাই দ্রুত বড়দিয়া খেয়াঘাট থেকে ফেরিঘাট পর্যন্ত জিও ব্যাগ ফেলে নদীতীরের বাসিন্দা ও দোকানপাট রক্ষার দাবি জানান তিনি।
কোটাকোল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাচান আল মামুদ বলেন, ব্রিটিশ আমলের বড়দিয়া বাজারটি খাশিয়াল ও কোটাকোল ইউনিয়নের মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। নদীভাঙনে বাজারটি ছোট হয়ে যাচ্ছে এবং ব্যবসায়ীরা সর্বস্ব হারাচ্ছেন। ভাঙন রোধে সংসদ সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানান তিনি।

নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ কুমার সাহা বলেন, নবগঙ্গা অত্যন্ত ভাঙনপ্রবণ নদী। ভাঙন প্রতিরোধে বিভিন্ন এলাকায় কাজ চলছে। বড়দিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে ভাঙন প্রতিরোধে কাজ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় তাৎক্ষণিক ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রস্তুতি রয়েছে। আপৎকালীন কাজের অংশ হিসেবে প্রয়োজন অনুযায়ী ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
প্রতিনিধি/এসএস




