টানা তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) পর্যটক ও জেলে-বাওয়ালিদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে সুন্দরবন। মাছ-কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করা উপকূলের মানুষের জন্য দিনটি স্বস্তির হওয়ার কথা থাকলেও প্রথম দিনেই দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। সকাল থেকে টানা বৃষ্টি, নদীতে মরা জোয়ার, মাছ পাওয়ার নিশ্চয়তা না থাকা এবং দস্যুদের আতঙ্কে জেলেদের অনেকেই বনে যেতে আগ্রহ দেখাননি।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, জেলে নৌকার তেমন ভিড় নেই। একটি নৌকা নিয়ে অনুমতিপত্র নিতে এসেছিলেন জহর আলী মালী। তবে সুন্দরবনের ভেতরে যাওয়ার ইচ্ছা নেই তাঁর। বনসংলগ্ন খোলপেটুয়া নদীতে মাছ ধরার পরিকল্পনা করেছেন তিনি।
জহর আলী বলেন, ‘আজ প্রথম দিনে পাস নিতে এসেছি। সুন্দরবনে এখন ডাকাতের ভয় আছে। তাই বনের ভেতরে যাব না। এই ফরেস্ট স্টেশনের পাশের খোলপেটুয়া নদীতে মাছ ধরব। সুন্দরবন দস্যুমুক্ত না হলে বনের বেশি গভীরে যাব না।’
বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা ইরফান উদ্দীন জানান, তাদের স্টেশনের আওতায় ৯৫৪টি নৌযানের বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) রয়েছে। কিন্তু মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টা পর্যন্ত জহর আলী ছাড়া আর কোনো জেলে পাস নিতে আসেননি। সকাল থেকে বৃষ্টি ও নদীতে মরা জোয়ার থাকায় মাছও কম পাওয়া যাচ্ছে। বেলা বাড়লে জেলের সংখ্যা বাড়তে পারে।

কৈখালী ও কদমতলা ফরেস্ট স্টেশনেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। দুই স্টেশন মিলিয়ে সকাল সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ৩৭ জন জেলে সুন্দরবনে অবস্থানের অনুমতি নিয়েছেন। অথচ এ দুই স্টেশনের আওতায় রয়েছে ১ হাজার ২৬টি নৌযানের বিএলসি।
বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনসংলগ্ন নদীতে নিজের নৌকার পাটাতন মেরামত করছিলেন জেলে খায়রুল সানা। তিন মাস সুন্দরবনে যেতে না পারায় সংসারে টানাটানির মধ্যে ছিলেন তিনি। খায়রুল বলেন, ‘সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরেই সংসার চলে। তিন মাস বনে ঢুকতে না পারায় খুব কষ্টে দিন কাটিয়েছি। এখন মাছ ধরতে না পারলে সংসার চলবে না।’ দুপুরের জোয়ারে বনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান তিনি।
পাশের নৌকায় মালামাল তুলছিলেন জেলে আব্দুর বারী। তিনি বলেন, একটি নৌকায় সাধারণত দুই থেকে তিনজন জেলে থাকেন। ছয় দিন বনে থেকে মাছ ও কাঁকড়া ধরে তারা ফিরে আসেন। বছরের প্রায় নয় মাস এভাবেই সুন্দরবন থেকে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করে তাদের সংসার চলে।
তবে এবার আয় নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তিনি। আব্দুর বারী বলেন, ‘ডাকাইত দলের সঙ্গে দেখা হলি মোটা অংকের টাকা দেওয়া লাগে। এবার বন্ধের সময় অনেকে বিষ মারি সব শেষ করিছে। তাই এবার আয় কেমন হবে, বলা যাতিছ না।’

জেলেদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার সময়ও কেউ কেউ বন বিভাগের নজর এড়িয়ে বনে ঢুকে বিষ দিয়ে মাছ ধরেছেন। এতে মাছ ও কাঁকড়ার পরিমাণ কমে গেছে বলে তাদের আশঙ্কা। এর সঙ্গে দস্যুদের চাঁদাবাজির ভয়ও রয়েছে।
তবে জেলেদের মধ্যে অনীহা থাকলেও তিন মাস পর সুন্দরবন খুলে দেওয়ার প্রথম দিন পর্যটকদের নিয়ে নৌযান চলাচল শুরু হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে পর্যটকদের উপস্থিতি অবশ্য কম ছিল।
সুন্দরবন ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন (টিওএএস) সূত্রে জানা গেছে, সংগঠনটির অধীনে বর্তমানে ৭৫টি নৌযান রয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি মো. মঈনুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার বলেন, মঙ্গলবার প্রথম দিন খুলনা থেকে সাতটি লঞ্চ ২২০ জন পর্যটক নিয়ে সুন্দরবনের উদ্দেশে যাত্রা করেছে।

শ্যামনগরের সুন্দরবনঘেঁষা মালঞ্চ নদীর পাড় থেকেও পর্যটকদের নিয়ে নৌকা ছাড়তে দেখা গেছে। মুন্সিগঞ্জ এলাকার মাঝি সাগর হোসেন দুই পর্যটককে নিয়ে বনের দিকে যাচ্ছিলেন। তিনি তাদের মায়ের খাল পর্যন্ত নিয়ে যাবেন।
সাগর হোসেন বলেন, ‘আমি নৌকা নিয়ে বনে মাছ ধরতে যাই না, পর্যটক নিয়ে ঘুরি। মালঞ্চ নদী ধরে বনের ভেতরে মায়ের খাল পর্যন্ত নিয়ে যাই। সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা ঘোরাই। এক ঘণ্টার জন্য ১ হাজার ২০০ টাকা নিই। আজই প্রথম ট্রিপ নিয়ে যাচ্ছি।’
পর্যটক ইমরান হোসেন বলেন, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনভূমির সৌন্দর্য উপভোগ করতে তাঁরা এসেছেন। কিন্তু অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে কাছাকাছি এসে আটকে যেতে হয়েছে। বৃষ্টি থামলে আবার যাত্রা করবেন।
পর্যটক নৌকার মাঝি আমিনুর রহমান বলেন, তিন মাস পর মঙ্গলবার তারা পাস পেয়েছেন। এতে তারা খুশি। তবে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করছেন। আবহাওয়া কিছুটা ভালো হলে সুন্দরবনে প্রবেশ করবেন।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, তিন মাস বন্ধ থাকার পর ১ সেপ্টেম্বর থেকে সাতক্ষীরা রেঞ্জের চারটি স্টেশন থেকে মাছ ধরা ও ইকোট্যুরিজমের জন্য পাস দেওয়া শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ১১টা পর্যন্ত ১৫৪টি পাস ইস্যু করা হয়েছে। এসব পাসের মাধ্যমে চার শতাধিক জেলে-বাওয়ালি সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতি পেয়েছেন।

তিনি বলেন, সাতক্ষীরা রেঞ্জের চারটি স্টেশন থেকে এ মৌসুমে প্রায় তিন হাজার বিএলসি নবায়ন করা হয়েছে। পর্যটকদের জন্য গলাগাছি ও দোবেকি ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রও প্রস্তুত রয়েছে। তবে আবহাওয়া বৈরী থাকায় প্রথম দিন পর্যটকদের তেমন আনাগোনা দেখা যায়নি। আবহাওয়া অনুকূলে এলে পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে বলে আশা করছেন তারা।
জেলেদের নিরাপত্তার বিষয়ে মশিউর রহমান বলেন, সুন্দরবন বন্ধ থাকার সময়ও কোস্টগার্ডের সঙ্গে যৌথ দল কাজ করেছে। এখনো যৌথ টহল কার্যক্রম চলমান রয়েছে। দস্যুদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে কোস্টগার্ডের সঙ্গে বন বিভাগের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর মাছের প্রজনন মৌসুম ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে পর্যটক ও জেলে-বাওয়ালিদের প্রবেশ বন্ধ থাকে। এ বছরও একই কারণে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে মঙ্গলবার থেকে সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
সুন্দরবনের প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা অভয়ারণ্য হিসেবে সংরক্ষিত। এসব এলাকায় সাধারণভাবে মাছ ধরা বা প্রবেশের সুযোগ নেই। ফলে অনুমতি নিয়ে বনে গেলেও পর্যটক ও জেলেদের নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলতে হবে।
বন বিভাগ জানিয়েছে, সুন্দরবনের পশ্চিম ও পূর্ব বিভাগের চারটি রেঞ্জে এবার ১২ হাজার নৌযানকে বিএলসি দেওয়া হচ্ছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোর পন্টুন মেরামত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজও করা হয়েছে।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এ জেড এম হাসানুর রহমান বলেন, পর্যটক ও মৎস্যজীবীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সুন্দরবনের ক্যাম্প ও স্টেশনগুলোকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটক, জেলে ও বননির্ভর মানুষের দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর ক্ষতি হয়—এমন কোনো কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না।
প্রতিনিধি/এসএস





