তথ্য অধিকার আইনে আবেদন গ্রহণ না করতে অধীনস্থ কর্মচারীদের মৌখিক নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বান্দরবান জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দের বিরুদ্ধে। এ কারণে ৪৫ কোটি ১৬ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন পানি ও স্যানিটেশন প্রকল্পের কাজ, ব্যয় ও বিল-ভাউচারসংক্রান্ত তথ্য চেয়ে আবেদন করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েছেন সাংবাদিকেরা।
সোমবার (৩১ আগস্ট) তথ্য অধিকার আইনে আবেদন জমা দিতে বান্দরবান জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের কার্যালয়ে গেলে কর্মচারীরা তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান।
অফিসের মাস্টার রোলে অফিস সহায়ক হিসেবে কর্মরত সুমন দাশ ও হিসাব সহকারী থংপ্রে ম্রো জানান, নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে তাদের মৌখিকভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি অফিসে উপস্থিত না থাকলে তথ্য অধিকার আইনের কোনো আবেদন গ্রহণ করা যাবে না।
তাদের ভাষ্য, ‘স্যার ছাড়া তথ্য অধিকার আইনের আবেদন গ্রহণ না করার জন্য আমাদের মৌখিকভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই আমরা আবেদনটি গ্রহণ করতে পারব না।’
যে প্রকল্পের তথ্য চাওয়া হয়েছিল
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ‘বান্দরবান পার্বত্য জেলার উপজেলাগুলোতে বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ কোটি ১৬ লাখ ২০ হাজার টাকা।
প্রকল্পের আওতায় ১০টি পরীক্ষামূলক নলকূপ, ১২টি জিএফএস মেরামত ও সংস্কার, ১০টি জিএফএস নির্মাণ, ৫৮৩টি রিংওয়েল ও ১৪০টি রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং ব্যবস্থা নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এ ছাড়া পাম্পসহ ১৫০×১০০ মিলিমিটার গভীর নলকূপ ৮৫টি, পাবলিক টয়লেটে পানি সরবরাহ ও বিদ্যুৎ সংযোগসহ ৩০টি, পাম্প হাউসে বৈদ্যুতিক সংযোগ ৮৫টি, স্ট্যান্ড পোস্ট ৮৫টি এবং বিভিন্ন ব্যাসের প্রায় ৮৫ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপনের কথা রয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ ব্যয় হিসেবে ৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা, স্টেশনারি, সিল ও স্ট্যাম্প ক্রয়ে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা, প্রচার ও বিজ্ঞাপনে ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা, সম্মানী ও পারিশ্রমিক বাবদ ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা, অন্যান্য ও মনিহারি ব্যয়ে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং কম্পিউটার সামগ্রী ক্রয়ে ৩ লাখ ১২ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

শতভাগ বাস্তবায়ন দেখিয়ে বিল উত্তোলনের অভিযোগ
প্রকল্পের বিভিন্ন কাজ শতভাগ বাস্তবায়ন দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়েছে—এমন অভিযোগের পর প্রকল্পের বাস্তবায়ন, ব্যয়, বিল-ভাউচার ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তথ্য অধিকার আইনে প্রস্তাবিত আবেদনে উপজেলা-ভিত্তিকভাবে প্রকল্পের আওতায় বাস্তবে কতটি রিংওয়েল, গভীর নলকূপ, রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং ব্যবস্থা, জিএফএস ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে, তা জানতে চাওয়া হয়। একই সঙ্গে এসব কাজের স্থান, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার বা বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের নাম, বরাদ্দ ও ব্যয়ের বিবরণ, কাজের পরিমাপ, বিল-ভাউচার এবং প্রকল্প বাস্তবায়নসংক্রান্ত অন্যান্য নথির তথ্য চাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কিন্তু আবেদনটি গ্রহণ না করায় প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সরকারি নথিপত্র যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আগেও তথ্য না দেওয়ার অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, এর আগেও বান্দরবান জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে তথ্য অধিকার আইনে একাধিকবার আবেদন করা হলেও চাওয়া তথ্য সরবরাহ করা হয়নি।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার, রোববার ও সোমবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের কার্যালয়ে গিয়েও নির্বাহী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলীসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
ডেইলি স্টারের বান্দরবান প্রতিনিধি মংসিং হাই মারমা বলেন, প্রকল্পটির তথ্য জানতে তথ্য অধিকার আইনের নির্ধারিত ফরমে আবেদন দিতে গেলে অধিদফতরের কর্মচারীরা তা গ্রহণ করেননি। নির্বাহী প্রকৌশলী আবেদন গ্রহণ না করতে মৌখিকভাবে নির্দেশ দিয়েছেন বলে তারা জানিয়েছেন।

তবে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন গ্রহণের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে কোনো লিখিত নির্দেশ দিয়েছেন কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে তার ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে কল ও ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হয়। তিনি বার্তাগুলো দেখলেও অভিযোগ বা তথ্য অধিকার আইনের আবেদন গ্রহণে বাধা দেওয়ার বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেননি।
বিষয়টি চট্টগ্রাম বিভাগীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের তিন পার্বত্য জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ফিরোজ আলম চৌধুরীকে জানানো হলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু করতে পারব না। কেউ যদি স্বেচ্ছায় তথ্য অধিকার আইনে আবেদন গ্রহণ করতে না চায়, সে ক্ষেত্রে আমার করার কিছু নেই।’
জনস্বার্থে বাস্তবায়নাধীন প্রায় ৪৫ কোটি টাকার প্রকল্পটির কাজ বাস্তবে কতটা হয়েছে, বরাদ্দ কীভাবে ব্যয় হয়েছে এবং শতভাগ বাস্তবায়ন দেখিয়ে বিল উত্তোলনের অভিযোগের সত্যতা কী—এসব যাচাই করতে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করতে গিয়ে এই বাধার সৃষ্টি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
প্রতিনিধি/এসএস





