আজই কি তোমার মধুর মূরতি, হেরিনু শারদ প্রভাতে! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শরৎ কবিতার এই পঙ্ক্তিমালায় শরতের যে মায়াবী রূপ ধরা পড়ে, কাশফুলের শুভ্রতায় যেন তারই বাস্তব প্রতিচ্ছবি। শরৎ এলেই মন ছুটে যায় ধবল কাশবনের খোঁজে। বাতাসে দুলতে থাকা সাদা কাশফুলের সারি মনে করিয়ে দেয়, শরৎ এসেছে।
নদীর পাড়, পুকুরের ধারে কিংবা বিস্তীর্ণ বালুচরে কোনো যত্ন-আত্তি ছাড়াই আপন মনে ফুটে থাকে কাশফুল। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, শরতের সাদা মেঘ যেন নেমে এসেছে ধরণির বুকে। একটু বাতাস পেলেই দলে দলে কাশফুল মাথা দোলায়। শুভ্রতার সেই ঢেউয়ে মুগ্ধ না হয়ে উপায় থাকে না।
কাশফুলের এই সৌন্দর্য অগোচরেই সব বয়সী মানুষের হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়। ইট-পাথরের যান্ত্রিক কোলাহল ছেড়ে ক্ষণিক প্রশান্তির খোঁজে মানুষ আসছেন কাশফুলের কাছে।

প্রকৃতির এমন মায়াবী রূপ দেখতে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুড়ভুড়িয়া ছড়ার পাড়ে ভিড় করছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা।
শনিবার (২৯ আগস্ট) বিকেলে দেখা যায়, পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের নিয়ে স্থানীয় প্রকৃতিপ্রেমীরা এখানে আসছেন। কেউ আনন্দে হারিয়ে যাচ্ছেন কাশবনে, কেউ তুলছেন ছবি। কেউ হাত বুলিয়ে নিচ্ছেন কাশফুলে। আবার অনেকে মুক্ত বাতাসে পুরো বালুচর ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সড়কের পাশে ব্যক্তিগত গাড়ি থামিয়ে কাশফুলের সঙ্গে ছবি তুলতেও দেখা যায় অনেককে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগস্টের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়ে সেপ্টেম্বরজুড়ে কাশফুলের এ মেলা থাকে। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে এখানে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়।
প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কাশফুল না ছিঁড়ে শুধু এর সৌন্দর্য উপভোগ করার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীরা।
পর্যটক সুমাইয়া আক্তার বলেন, শহরের ব্যস্ত জীবনে প্রকৃতির কাছে আসার সুযোগ খুব কম। এখানে এসে মনে হচ্ছে, কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও অন্য রকম একটি জগতে চলে এসেছি। কাশফুলের সঙ্গে ছবি তোলার পাশাপাশি এই পরিবেশটাও উপভোগ করছি।

পর্যটক নীলা দত্ত বলেন, কাশফুলের সৌন্দর্য আসলে ছবিতে পুরোপুরি ধরা যায় না। সামনে দাঁড়িয়ে বাতাসে দুলতে থাকা কাশবন দেখলে মনে হয়, শরৎ যেন সত্যিই এখানে নেমে এসেছে।
জেলা শহর থেকে বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে এসেছেন সাকিব খান। তিনি বলেন, রাশি রাশি কাশফুল ছড়াচ্ছে শ্বেতশুভ্র নৈসর্গিকতা, যা মুগ্ধ করছে প্রকৃতিপ্রেমীদের। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, ছবি তোলার নামে একদল মানুষ এসব ফুল ছিঁড়ে সৌন্দর্য নষ্ট করছেন। তাই স্থানীয়দের প্রতি অনুরোধ, কেউ যেন এসব ফুল না ছিঁড়ে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন। তা না হলে কাশফুল ও ওই এলাকার সৌন্দর্য—দুটোই নষ্ট হবে।
পরিবার নিয়ে আসা পর্যটক জাকির হোসেন বলেন, ছোটবেলায় গ্রামে কাশফুল দেখেছি। এখন সন্তানদের নিয়ে এসে সেই স্মৃতিটাই যেন আবার ফিরে পেলাম। বাচ্চারাও খুব আনন্দ করছে। এমন প্রাকৃতিক জায়গাগুলো সংরক্ষণ করা দরকার।

স্থানীয় পরিবেশকর্মী রাজেশ গোয়ালা বলেন, শরতে চায়ের রাজ্য শ্রীমঙ্গল এখন সেজেছে কাশফুলের শুভ্রতায়। এই সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন হাজারো প্রকৃতিপ্রেমী। তবে কাশফুল দেখতে আসা দর্শনার্থীদের অসচেতন আচরণ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগও রয়েছে। কেউ কেউ কাশফুল ছিঁড়ে ফেলছেন, নষ্ট করছেন গাছপালা। এতে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা কাশবনের সৌন্দর্য ও বিস্তৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বাপার জাতীয় পরিষদ সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা কোনো কিছুর পরিবর্তন প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তনকেই নির্দেশ করে। জ্বালানি বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহারের জন্য না হলেও, অন্তত মানুষের সৌন্দর্যপ্রীতির চাহিদার কথা বিবেচনায় আগের মতো দিগন্তবিস্তৃত কাশবন থাকা প্রয়োজন।
প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা এই কাশবন রক্ষায় দর্শনার্থীদের দায়িত্বশীল আচরণ করা প্রয়োজন। কাশফুল না ছিঁড়ে এবং কাশবনের ভেতরে না ঢুকে দূর থেকে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার আহ্বান জানান এই পরিবেশকর্মী।
প্রতিনিধি/এআর




